হারিয়ে যাচ্ছে পৌষের উৎসব

অগ্রহায়ণ শেষে পৌষ এলে একদা গ্রামবাংলায় পৌষমেলার উৎসবে বাঙালি মেতে উঠতো। সেই পৌষমেলার আয়োজন আজ গ্রাম বাংলা থেকে বিলুপ্তির পথে। একদা পৌষমেলা চলতো ৭দিন থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত। মেলার আকষণ ছিলো-নাগরদোলা, সাপুড়ের খেলা, যাত্রাভিনয়, বাউলের আসর, ক্রীড়া প্রদর্শন, হিজড়াদের নাচের আসর, কবিগান, পুতুল নাচ ইত্যাদি। সব বয়সের মানুষকে আকৃষ্ট করতো পৌষমেলা। নতুন ধান বিক্রি করে টাকা নিয়ে মেলায় গিয়ে যাত্রা দেখাও অনেকের নেশা হয়ে দাঁড়াতো। সারারাত ধরে যাত্রা দেখে ঘরে ফেরা সে এক আনন্দের দিন ছিল বাঙালির। শুধু তাই নয়, সারারাত ধরে কবিগান, গম্ভীরা, নাচ দেখে দেখে বাঙালি মাতোয়ারা হয়ে উঠতো।

মেলায় হস্তশিল্পের পসারিরা তাদের শিল্প সামগ্রী নিয়ে আসতেন। সঙ্গে থাকত গ্রামীণ শিল্পী ও কারিগরদের চারু ও কারুশিল্পের প্রদর্শনী। মাটির-কাঁচের-ধাতুর পুতুল, গয়না, তাঁতের-মিলের পোশাক, বাসনপত্র আরও কত কী পাওয়া যেতো পৌষমেলায়। থাকতো অগুণতি খাবারের দোকান। কোনো কোনো দিন সন্ধ্যায় মূল আকর্ষণ থাকতো বাজি পোড়ানো। রঙ-বেরঙের ফানুস আর আতশবাজিতে আকাশ অনেকক্ষণ লাল হয়ে থাকতো। বাজি দেখতে দূর-দূরান্তের গ্রাম ও আশেপাশের গাঁও থেকে শত শত লোকের সমাগম হতো। পৌষমেলায় বাজির জন্যেই লোকের ভিড় জমতো। শীতের মধ্যরাতেও গ্রাম বাংলার মানুষের মধ্যে ছিল ব্যস্ততা। শেষ রাতে কিছুটা ঝিমিয়ে পড়লেও পরদিন থেকেই আবার শুরু হয়ে যায় মেলার কলরব।

মেলা-পার্বণগুলোর মধ্যে পৌষমেলাও একদিন জনপ্রিয় ছিল। মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলনের জন্য যে অনুষ্ঠান তাই হলো মেলা। পৌষ মেলাও হলো এমনি একটি। এ মেলায়ও একদা জাতিধর্ম সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষ মিলিত হতো। এখনও যে ধরনের মেলা আয়োজন হোক না কেন, জাতি ধর্ম সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবাই উপস্থিত হন। এই মেলায় এক গাঁয়ের মানুষের সঙ্গে দূর গাঁয়ের মানুষের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ হয়।

গ্রামাঞ্চল থেকে পৌষমেলা প্রায় বিলুপ্তির পথে হলেও শহরেও এখন বিভিন্ন ধরনের মেলা হতে দেখা যায়। গ্রামে যে মেলা হোক না কেন, শহুরে জীবনের সঙ্গে জড়িত নানান সামগ্রী এখন গ্রামীণ মেলার অঙ্গ হওয়াতে মেলার নিজস্বতা আজ অনেকটা হারিয়ে গেছে। আধুনিক বিলাসদ্রব্যের পসরা, হালকা বিনোদন, চা-কফির দোকান সব মিলিয়ে মেলার সেই ঐতিহ্য ও আকর্ষণ যেন অনেকটা ম্লান।

মেলায় খোলা আকাশের নিচে বিভিন্ন ধরনের গান করেন শিল্পীরা। উদাত্ত কণ্ঠে তারা যখন গেয়ে ওঠেন-‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে আয়রে চলে আয়ঃ আয়ঃ’ তখন সমবেত সকলের চোখে-মুখে ছড়িয়ে যায় মুগ্ধতার আমেজ। আর কীর্তন, পালাগান, বাউল গান হলেতো কথাই নেই। উপস্থিত সংগীতপ্রেমিকরা খুঁজে পায় বাঙালির ঐতিহ্যময় দিনগুলিঃ।

গ্রাম বাংলার মানুষ এখনও শত ব্যস্ততার মধ্যে চায় একটু আনন্দ বিনোদন। পৌষ মেলা এরকমই এক অনুষ্ঠান, যা বাঙালিকে দিতে পারে আনন্দ। তাই গ্রাম বাংলায় পৌষমেলার গুরুত্ব এখনও ফুরিয়ে যায়নি। পৌষ মেলা বছরের পর বছর অনুষ্ঠিত হোক-এই আমাদের প্রত্যাশা। কেননা, কবি-গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, গন্ডিবদ্ধ গ্রামীণ মানুষ মেলার মধ্য দিয়েই বৃহৎকে উপলব্ধি করে।।বিশ্বকে অনুভব করার সুযোগ পায়। তাঁর কথায়-‘এই মেলাই আমাদের দেশে বাহিরকে ঘরের মধ্যে আহ্বান করে। এই উৎসবে পল্লী আপনার সমস্ত সংকীর্ণতা বিস্মৃত হয়।।তাহার হৃদয় খুলিয়া দান করিবার ও গ্রহণ করিবার এই প্রধান উপলক্ষ। ঃ এইখানেই দেশের মন পাইবার প্রকৃত অবকাশ ঘটে।

লিয়াকত হোসেন খোকন

খবরটি পড়েছেন :199
  • Print
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Google Bookmarks
  • email
  • LinkedIn
  • Twitter
  • Add to favorites
  • StumbleUpon
  • PDF

এমন আরো কিছু পোষ্ট:

  1. পালকি ঃ হারিয়ে যাচ্ছে কালচক্রে
  2. ফেসবুকের জনপ্রিয়তা কি হারিয়ে যাচ্ছে?
  3. জামাইমেলা
  4. মুন্সীগঞ্জে ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী দশমী মেলা শুরু
  5. বিয়ে বিচ্ছেদ মেলা!
  6. উঠে যাচ্ছে আজিজ সুপার মার্কেটের বইয়ের দোকান
  7. বিজয় দিবস পৌষের এই দিনেঃ
  8. কালসায়রে হারিয়ে গেলো
  9. ইতালিতে বিবাহ বিচ্ছেদ মেলা
  10. বাঙালির থালা থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে মাছ!

You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0 feed. You can leave a response, or trackback from your own site.

Leave a Reply

XHTML: You can use these tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>