বাঙালির থালা থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে মাছ!
আলতাব হোসেন
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ‘মাছে ভাতে বাঙালির’ পাত থেকে মাছ উধাও হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেশি মাছের প্রজনন মৌসুমে দীর্ঘমেয়াদি খরার কারণে এবার মা-মাছ ডিম ছাড়তে পারেনি। ফলে মিঠাপানির দেশি মাছের উৎপাদন কমে যাবে।
জীববৈচিত্র্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলা বৈশাখ -জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে বজ্রপাত শুরু হলে মাছ, ব্যাঙ ও সরীসৃপ জাতীয় প্রাণীর প্রজনন শুরু হয়। দেশের প্রধান তিনটি নদী পদ্মা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদীগুলোতে মা-মাছ এসে ডিম পাড়ে। এ বছর বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় মাছের প্রজনন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এ বছর বেশির ভাগ মিঠাপানির মাছের উৎপাদন কমে যাবে। ইতিমধ্যে বাজারে দেশি মাছের উপস্থিতি কমে গেছে। এ ছাড়া বর্তমান শুকনো মৌসুমে জলাশয়গুলো থেকে জেলেরা মা-মাছ ধরে ফেলেছে। ফলে আগামীতে যথাসময়ে বৃষ্টি হলেও মা-মাছের অভাবে পর্যাপ্ত মাছ মিলবে না।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. আবদুল ওয়াহাব সমকালকে বলেন, বৃষ্টি না হওয়ায় এবার দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী, কুষ্টিয়া ও চলনবিল এলাকায় মাছ ডিম ছাড়তে পারেনি। বিলম্বে সিলেট অঞ্চলে বৃষ্টি হলেও মাছ ডিম ছাড়তে পারেনি। প্রজনন সময়ে নতুন পানি না পাওয়ায় এসব ডিম মা-মাছের গায়ে মিশে গেছে। ফলে বর্তমানে এসব অঞ্চলে জেলেদের জালে ছোট মাছের উপস্থিতি কমে গেছে। মাছের উৎপাদন বাড়াতে তিনি নদী ও বিলের মধ্যকার সংযোগ খালগুলো খননের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
দীর্ঘদিন ধরে ছোট মাছ নিয়ে গবেষণারত ড. ওয়াহাব বলেন, প্রাকৃতিক উৎসে অনাদরে অযত্নে উৎপাদিত এ সব মাছের ওপরই আদিকাল থেকে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর এক বিশাল অংশ তাদের দৈনন্দিন প্রাণিজ আমিষ, খণ্ডকালীন কর্মসংস্থান এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্রমেই দেশি মাছ বিলুপ্ত হচ্ছে। এভাবে ছোট মাছ বিলুপ্ত হলে দশ বছর অন্তর তা ২৫ ভাগ হারে কমে যাবে। ফলে আগামী ৪০ বছর পর এ সব মাছ চিরতরে হারিয়ে যাবে।
মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, খরার কারণে এ বছর উন্মুক্ত জলাশয়ের দেশি মাছের উৎপাদন কিছুটা কমে যেতে পারে। তবে খামারে এবার মাছের উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। ফলে মাছের সংকট হবে না বলে তিনি মনে করেন।
মৎস্য অধিদফতরের হিসাবে দেশে ছোট-বড় প্রায় ৭৫০টি নদ-নদী, অসংখ্য খালবিল, হাওর-বাঁওড়, পুকুর-দিঘি, ডোবা-নালা এবং প্লাবনভূমি মিলিয়ে মোট আয়তন হচ্ছে প্রায় ৪৩ লাখ ৪৭ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে প্লাবন ভূমি ও খালবিল, ডোবা-নালা এবং নদ-নদীর আয়তনই হচ্ছে ৪০ লাখ হেক্টর। এ সব জলাশয়ে প্রায় ২৬০ প্রজাতির মিঠাপানির মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি এবং ১২ প্রজাতির বিদেশি মাছসহ মোট ২৯৬ প্রজাতির মাছ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২০০ প্রজাতিই হচ্ছে দেশি প্রজাতির ছোট মাছ। যেমন চেলা-ঢেলা-মলা, শিং-মাগুর-কৈ, ফলি-খলিশা-দারকিনি, পুঁটি-টাকি-মেনি, পাবদা কাজলী-কাচকি ইত্যাদি। এ মাছগুলো ভরা বর্ষা ছাড়া ডিম পাড়তে পারে না। এ বছর বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় এ মাছগুলো কম ডিম পেড়েছে বলে ধারণা করছেন আইইউসিএনের বিজ্ঞানীরাও। আবহাওয়া অধিদফতরের হিসাবে বৈশাখ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত স্বাভাবিকের চেয়ে গড়ে প্রায় ৪৯ শতাংশ বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব কনজারভেশন নেচার-আইইউসিএনের জরিপে দেখা গেছে, দেশে মিঠাপানির মোট মাছের প্রজাতির সংখ্যা ২৮৮টি। আইইউসিএন জরিপ মতে ইতিমধ্যে ৫৪ প্রজাতির ছোট মাছ হারিয়ে গেছে।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের অভিমত, মৎস্য সংরক্ষণ আইন ১৯৫০-এর সংশোধন ও পরিবর্তন করে প্রতি বছর বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় এই তিন মাস এ সব দেশি ছোট প্রজাতির মা-মাছ ও পোনা মাছ ধরা, মারা, বিপণন নিষিদ্ধ করা এবং শিল্পকারখানার বর্জ্য উন্মুক্ত জলাধার বা জলাশয়ে নির্গতকরণ থেকে কঠোরভাবে বিরত রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়াও বর্ষা মৌসুমে মাছ চাষের কুমিল্লার দাউদকান্দি মডেল সারাদেশে কার্যকর করা গেলে মাছ সংকট কমবে।
খবরটি পড়েছেন :345
এমন আরো কিছু পোষ্ট:
- বাঙালির ইলিশপ্রীতি
- সবচেয়ে গভীর জলের মাছ
- বৃটেনে বিচার বিভাগের ৫ হাজার কর্মচারীর তথ্য উধাও
- পালকি ঃ হারিয়ে যাচ্ছে কালচক্রে
- বাঙালির মানবপ্রেম
- উঠে যাচ্ছে আজিজ সুপার মার্কেটের বইয়ের দোকান
- হারিয়ে যাচ্ছে পৌষের উৎসব
- স্মৃতির অংশ মুছে ফেলা সম্ভব হতে যাচ্ছে
- ঘুম থেকে উঠেই ফেসবুকে বসে এক-তৃতীয়াংশ মেয়ে
- মুজাহিদকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না : পুলিশ কমিশনার
You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0 feed. You can leave a response, or trackback from your own site.
