উঠে যাচ্ছে আজিজ সুপার মার্কেটের বইয়ের দোকান
বইয়ের আড্ডায় ভাটা, এখন পদচারণা ফ্যাশন সচেতনদের
মেধা ও মননের বিকাশে শিল্প সাহিত্যের চর্চায় পুঁজি একটা বড় ভূমিকা পালন করে। কিন্তু মুনাফা যেদিকে গড়ায় পুঁজিও সেদিকে যায়। তাই আজিজ সুপার মার্কেটে এখন বই, কাগজ ও কালির গন্ধ আগের মতো আর পাওয়া যায় না। সেখানে এখন স্বদেশী পোশাকের কাপড়ের ও রঙের গন্ধই নাকে এসে বেশি লাগে। কবি, সাহিত্যিক ও লেখকদের আনাগোনা হয়ত খুব বেশি না কমলেও আড্ডাটা জমে না এবং সেখানে বেড়ে গেছে ফ্যাশন সচেতন তারুণ্যের পদচারণা। ঢাকার প্রাণকেন্দ্র শাহবাগে অবস্থিত বইপাড়া নামে খ্যাত এ মার্কেটটি এখন হয়ে উঠেছে দেশের টি শার্টের অন্যতম বাজার। পেশাদারিত্ব নিয়ে যাঁরা বইয়ের ব্যবসা শুরু করেছেন তাঁরা এখনও টিকে আছেন, আর যাঁরা তা করতে পারেননি তাঁরা দোকান ছেড়ে দিয়েছেন। বিগত কয়েক বছরে এখান থেকে এভাবেই হারিয়ে গেছে অনেক বইয়ের দোকান। শুধু আজিজ মার্কেটই নয়, নিউমার্কেট, নীলক্ষেত থেকেও হারিয়ে গেছে অনেক বইয়ের দোকান। এসব স্থানে এখন সৃজনশীল প্রকাশক ও বই বিক্রয়ের দোকানের সংখ্যা হাতেগোনা। মুক্ত চিন্তার মানুষের কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠা আজিজ মার্কেট, নিউমার্কেট ও নীলক্ষেত এখন দখল করে নিয়েছে অধিক মুনাফা অর্জনকারী নানা পণ্যের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান।
উল্লেখ্য, ১৯৮৭ সালে ‘পাঠক সমাবেশ’ নামে একটি বইয়ের দোকান নিয়ে আজিজ মার্কেটের যাত্রা শুরু। এরপর বুক পয়েন্ট, প্রাকৃতজন, মনন প্যাপিরাস, গ্রন্থ গ্যালারি, প্রাচ্য বিদ্যা, সুখ, এপিক ইত্যাদি নামে কয়েক বছরের মধ্যেই ৬০ টির অর্ধিক বইয়ের দোকান গড়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠার এক বছরেই বইয়ের মার্কেট হিসেবে খ্যাতি লাভ করায় কলকাতার ‘দেশ’ পত্রিকা মন্তব্য করে আজিজের বইপাড়া যেন বাংলাদেশের কলেজ স্ট্রিট। তবে এর সাহিত্য পরিমণ্ডল আগের মতো নেই।
এ প্রসঙ্গে কবি রবিউল হুসাইন বলেন, মানুষের স্বভাব হলো লাভের দিকে ঝুঁকে পড়া। মানুষ বাণিজ্যিক লাভ লোকসানের দিকে লক্ষ্য রাখতে গিয়ে মেধা ও মননের চর্চার সুন্দর এই জায়গাটিকে নষ্ট করেছে। স্বদেশী পোশাকের কথা বলে ফ্যাশনকে ঢুকিয়ে দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, আগের থেকে কম যাই। মাঝে মধ্যে যাই বই কিনতে। তবে আজিজে যারা পেশাদারিত্ব বই ব্যবসায়ী, তাঁরা কঠোর হলে এ বিষয়টি রোধ করতে পারত। শক্ত একটি নীতিমালা করে নিলেই হতো যে, এখানে ব্যবসা করতে হলে বইকেই বেশি প্রাধান্য দিতে হবে।
কবি মহাদেব সাহা বলেন, এক সময় নিউ মার্কেটই প্রধান বইয়ের অঞ্চল ছিল। বলাকা বিল্ডিংয়েও কিছু বইয়ের দোকান ছিল। আর নীলক্ষেত সৃজনশীল নয়, পাঠ্য প্রস্তুকের মার্কেট হিসাবে গড়ে উঠেছিল। এসব স্থানে তো এখন সৃজনশীল বইয়ের দোকান নেই বললেই চলে। বলাকা বিল্ডিংয়ে এখন বইয়ের দোকান হয়েছে। জুতা ও কাপড়ের দোকান। ঢাকার কোথাও বইয়ের দোকান নেই। গুলশানে আছে ২টি, ধানমণ্ডিতে একটি আর উত্তরায়তো কোন দোকানই নেই। সেই হিসাবে আজিজ মার্কেট বইপাড়া হিসাবে গড়ে উঠেছিল শুনে খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু আজ তাও হারিয়ে যাচ্ছে। এমনটি ঘটছে অন্য ব্যবসায় লাভ বেশি বলেই হয়ত। কিন্তু কলকাতা কলেজ স্ট্রিটে এখনও প্রতি সন্ধ্যায় মানুষ লাইন ধরে বই কেনে। সেখানে বইয়ের দোকান ছাড়া অন্য কোন দোকান নেই। ঐই চর্চাটা আমরা এখনও গড়ে তুলতে পারিনি।
প্যাপিবাসের প্রকাশক জনকণ্ঠকে বলেন, আজিজ মার্কেটে বইয়ের দোকান কমেনি। যারা পেশাদারিত্ব নিয়ে ব্যবসা করতে পারেনি, শুধু তারা দোকান ছেড়ে চলে গেছে। কাপড়ের দোকান বাড়ছে এর অর্থ বইয়ের দোকান কমছে, তা নয়। এখানে অনেক ধরনের ব্যবসায়ীও ছিল, তাঁরা দোকান ছেড়ে দেয়ায় সেসব দোকানে পোশাক বিক্রি শুরু হয়েছে। এই মার্কেটটি যে শুধু বইয়ের মার্কেট হবে এমন কোন লিখিত প্রমাণ আমার জানা নেই। শুরুতে এটা অন্য মার্কেটের মতো জেনারেল মার্কেটই হওয়ার কথা ছিল। এর নিচতলাতেই ছিল কাপড়ের দোকান, জুতার দোকান। কিন্তু তারা ব্যবসা করতে না পেরে ছেড়ে চেলে গেছে। সেখানে পরে হয়েছে বইয়ের দোকান। এভাবেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে ব্যবসার। তবে এখনও এই মার্কেটই সেই মৌলিক জায়গাটি ধরে রেখেছে। কেউ কোন বিদেশী বই বা সৃজনশীল বই খুঁজতে এখানেই আসেন এবং পেয়েও যান। এখানে এখনও কবি সাহিত্যিকদের আড্ডা বসে, হয়ত তার ধরন চেঞ্জ হয়েছে। আগে আড্ডা হতো মার্কেটের সামনে আর এখন হয় ভিতরে। তিনি আরও বলেন, বইয়ের ব্যবসার সঙ্গে মারণ আছে এক ধরনের ভালবাসা আছে তা পোশাক ব্যবসায়ীরা বুঝবে না।
এ মার্কেটে ফ্যাশন হাউসের যাত্রা শুরু হয় নিত্য উপহারের ডিজাইনার বাহার রহমানের হাত ধরে। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, এখন এ মার্কেটে এক শ’ উপরে টি শার্টের দোকান আছে। আর সব কটিতেই স্বদেশী পোশাক বিক্রি হচ্ছে। বিদেশী আমদানি করা বইয়ের মতো পোশাক আমদানি করে বিক্রি হচ্ছে না। পোশাকে দেশী চেতনার নব জাগরণ ঘটেছে এই মার্কেটে। এই মার্কেটে স্বদেশী পোশাকের মতো বই ব্যবসায়ীরা স্বদেশী বই বাজারজাত করত তাহলে মার্কেটের চেহারাই পাল্টে যেত। এতে দেশী লেখকরাও লাভবান হতো, আর আমরা গর্ব করে বলতে পারতাম এই মার্কেটে বিদেশী কোন পণ্য নেই, এমনকি বইও। কিন্তু এই মার্কেটের অধিকাংশ ব্যবসায়ী আমদানিকৃত বই বিক্রি করে। বৈশ্বিক জ্ঞান আহরণের জন্য বাইরের বই প্রয়োজন স্বীকার করি, কিন্তু আমাদের দেশেরও তো অনেক বিষয় আছে জানার যার ওপর কোন বই নেই। সেসব বই তারা প্রকাশ করছে না, কারণ তাতে তাদের মুনাফা নেই, তাই। যদি তা করত তাহলে আমাদের লেখক ও পাঠক দুই-ই উপকৃত হতো। আমি মনে করি স্বদেশী বিষয়ে ব্যবসা করার জন্য দেশপ্রেম থাকা দরকার। এছাড়া সময়ের পরীক্ষায় আমাদের সবাইকে উত্তীর্ণ হতে হবে এবং আধুনিক হতে হবে।
number of view: 138
Related posts:
- মুন্সীগঞ্জে ইউপি চেয়ারম্যান আজিজ মলিককে হত্যার চেষ্টা : গাড়ি ভাংচুর
- হারিয়ে যাচ্ছে পৌষের উৎসব
- বাঙালির থালা থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে মাছ!
- সৌদি বিশ্ববিদ্যালয়ে সুপার কম্পিউটার
- মুজাহিদকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না : পুলিশ কমিশনার
- কক্সবাজারে দু’টি বিমানের মালিক পাওয়া যাচ্ছে না
- ফেসবুকের জনপ্রিয়তা কি হারিয়ে যাচ্ছে?
- বয়ফ্রেন্ডের জন্য মাংস চুরি
- কত বড় টাইটেল
You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0 feed. You can leave a response, or trackback from your own site.
