হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন ঋণগ্রস্ত চোখে

নি র্ম লে ন্দু গু ণ
বাংলাদেশের শুধু নয়, সমকালীন বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও চিত্রপরিচালক হুমায়ূন আহমেদের কাছে আমার কিছু ব্যক্তিগত ঋণ আছে। সেসব ঋণের কথা পাঠককে জানানোর জন্য তার জন্মদিনকেই উত্তম উপলক্ষ বলে মনে করি।

ঋণ নম্বর এক
১৯৯১ সালে আমি যখন স্বতন্ত্র প্রার্থী (গ্রামবাংলার নিরক্ষর মানুষ স্বতন্ত্র শব্দটি যথাযথভাবে উচ্চারণ করতে পারে না বলে তারা বলত_ ষড়যন্ত্র) হিসেবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলাম, তখন তিনি আমার জামানতের টাকাসহ আমাকে কিছু টাকা দিয়েছিলেন। আমাকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন না দেওয়ার ব্যাপারটি তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাই শুধু কিছু টাকা দিয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি, তার স্ত্রী-কন্যা এবং অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূরকে (নূর তখনও আওয়ামী লীগে যোগ দেননি) সঙ্গে নিয়ে আমার পক্ষে ভোট প্রার্থনা করতে আমার নির্বাচনী এলাকা বারহাট্টা ও নেত্রকোনায় গিয়েছিলেন। সেবার তার সদ্যকেনা স্টেশন ওয়াগনটি আমার গ্রামের বাড়ির উঠানের শোভাবর্ধন করেছিল। তার আগ পর্যন্ত আমার গ্রামের বাড়িতে কখনও কোনো গাড়ি প্রবেশ করেনি। হুমায়ূন আমার পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার কারণে সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে আমার নির্বাচনী এলাকায় আমার গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। তিনি সেবার বারহাট্টা, ঠাকুরাকোনা, বাংলা এবং গভীর রাতে নেত্রকোনা শহরে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ নির্বাচনী জনসভায় আমার জন্য ভোট প্রার্থনা করেছিলেন। তাকে ও তার জনপ্রিয় টিভি নাটক ‘অয়োময়’-এর নায়ক আসাদুজ্জামান নূরকে কাছ থেকে দেখার জন্য সমবেত জনতাকে এই বলে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, কবি নির্মলেন্দু গুণ যদি নির্বাচনে জামানত হারায়, তাহলে কবির চেয়ে তারই বেশি ক্ষতি হবে। ভোট দেওয়ার সময় ভোটাররা যেন সেদিকে খেয়াল রাখেন। অন্ততপক্ষে কবির জামানতটা যেন খোয়া না যায়।
তিনি সদলবলে ঢাকায় ফিরে যান। দু’দিনের বিরতি শেষে যথাসময়ে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়। বিকেলের দিকে শুরু হয় ভোট গণনা। গভীর রাতে নির্বাচন কমিশনের আয় বৃদ্ধি করে বহু প্রত্যাশিত নির্বাচনের বেসরকারি ফল প্রকাশিত হয়। সরকারিভাবে কী হয়েছিল জানি না, বেসরকারিভাবে আমি পরাজিত হই। নির্বাচনে আমি সর্বমোট ১ হাজার ২৪৯ ভোট পাই। আমি প্রায় ৪০ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হই এবং প্রায় ১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে হুমায়ূন তার জামানত হারান। আগে কখনও বলিনি, আজ তার ৬২তম জন্মদিনে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার সংলাপ ধার করে বলি_ হুমায়ূন, বহু চেষ্টা করেও আপনার জামানতের টাকাটা আমি রক্ষা করতে পারিনি, জনাব। আপনি আমাকে মাফ করবেন।

ঋণ নম্বর দুই
হুমায়ূন আহমেদ তার একটি উপন্যাস (আমার আছে জল) আমাকে উৎসর্গ করেছেন। অনতিবিলম্বে আমিও তাকে আমার একটি গ্রন্থ (ভলগার তীরে, ভ্রমণ কাহিনী) উৎসর্গ করে তার জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু জবাবটা আদৌ সমানে সমানে হয়েছে বলে মনে হয় না। ‘আমার আছে জল’ চিত্রায়িত হয়ে চলচ্চিত্রের দর্শকদের চিত্ত জয় করেছে। গত ২৫ বছরে কম করেও বইটির ১০-১৫টি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। পক্ষান্তরে আমার রচিত লেনিনের শিশুবেলানির্ভর ভ্রমণ কাহিনী ‘ভলগার তীরে’ গ্রন্থটি আজও দ্বিতীয় সংস্করণের মুখ দেখেনি। এই উৎসর্গ-বাণিজ্য-ঘাটতির কারণে আমি তার কাছে ঋণী হয়ে রয়েছি।

ঋণ নম্বর তিন-চার-পাঁচ
তিনি তার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক জনপ্রিয় উপন্যাস ‘জোৎস্না ও জননীর গল্প’-এ আমার ‘আগ্নেয়াস্ত্র’ কবিতাটি ব্যবহার করেছেন। কোনো কোনো সাক্ষাৎকারে আমাকে তার প্রিয় কবি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আমার গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির জন্য তিনি সর্বদা আমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ থেকেছেন।
আমার কন্যা মৃত্তিকাকে তার নাটকে অভিনয় করার সুযোগ দিয়েছেন।

ঋণ নম্বর ছয়
হুমায়ূনের কাছে আমার ষষ্ঠ ঋণটি হচ্ছে, আমার প্রতিষ্ঠিত কাশবন বিদ্যানিকেতনকে ঘিরে।
নির্বাচনে অংশগ্রহণের সময় আমি প্রায় শতবর্ষ আগে আমাদের গ্রামে আমার ঠাকুদাদা রামসুন্দর গুণ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত প্রাইমারি স্কুলটিকে হাইস্কুলে পরিণত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে অগ্রসর হয়ে প্রচণ্ড অর্থকষ্টের সম্মুখীন হই। তখন হুমায়ূন আহমেদ আমার প্রিয় স্কুলটিকে ১৫ হাজার টাকা দান করেছিলেন।
আজ যখন কাশবন বিদ্যানিকেতন কিছুটা সুদিনের পথে পা বাড়িয়েছে, তখন আমি কৃতজ্ঞচিত্তে হুমায়ূন আহমেদের অবদানের কথা স্মরণ করছি।
তিনি নিজেও তার গ্রামে একটি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন, তার পিতার নামে সেখানে একটি পাঠাগারও গড়েছেন। ওই পাঠাগার ও স্কুল পরিদর্শনে আমি অকালপ্রয়াত ড. হুমায়ুন আজাদ ও ইমদাদুল হক মিলনের সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের গ্রামের বাড়ি মজলিশপুরে গিয়েছিলাম। সালটা সঠিক মনে নেই। বন্ধু হুমায়ূন আজাদের অকাল-করুণ মৃত্যুর কারণে সেই আনন্দযাত্রার ঘটনাটি আমাদের জন্য একটা প্রচণ্ড দুঃখের স্মৃতি হয়ে আছে।
সম্প্রতি আমিও আমার গ্রামের বাড়িতে একটি পাঠাগার গড়েছি। আমার ঠাকুদাদার নামে পাঠাগারের নাম রেখেছি রামসুন্দর পাঠাগার। বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক পত্রিকা ‘প্রথম আলো’র প্রচার-কল্যাণে ঘটনাটি বহুল প্রচারিত। কিন্তু গ্রামের বাড়িতে হুমায়ূন আহমেদের স্কুল ও পাঠাগার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সেভাবে প্রচারে আসেনি। আসা উচিত।
হুমায়ূন, আপনার সুবিধামতো সময়ে কাশবন বিদ্যানিকেতন ও রামসুন্দর পাঠাগার পরিদর্শনের জন্য আমি আপনাকে সাদর আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।
আপনার জন্মদিন দেশবাসীর জন্য মঙ্গলময় হোক।

খবরটি পড়েছেন :1172
  • Print
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Google Bookmarks
  • email
  • LinkedIn
  • Twitter
  • Add to favorites
  • StumbleUpon
  • PDF

এমন আরো কিছু পোষ্ট:

  1. হুমায়ূন আহমেদের মন্তব্যে নিন্দার ঝড়
  2. হুমায়ূন আহমেদের সাক্ষাত্‍কার, হুমায়ুন আজাদের আমেরিকা প্রীতি ও ফরহাদ মজহারের দৃষ্টিতে লেখক স্বাধীনতা
  3. শুভ ৬১তম জন্মদিন, স্যার!
  4. জয়তু কথাশিল্পের কবি হুমায়ূন আহমেদ
  5. হুমায়ূন আহমেদ, এক চক্ষুষ্মান তীরন্দাজ
  6. শেল্টেক পদক পেলেন কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ও স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন
  7. ঋণগ্রস্ত রাষ্ট্রের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
  8. বিবাহবার্ষিকী, জন্মদিন, মা দিবস পালন করা ইসলাম বিরোধি: সৌদি খতিব
  9. বিদেশি চোখে বাংলাদেশের প্রকৃতি
  10. কবি ও গীতিকার অতুল প্রসাদ সেনের জন্মদিন

You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0 feed. You can leave a response, or trackback from your own site.

Leave a Reply

XHTML: You can use these tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>