প্রবাসে গুঞ্জন : কে হচ্ছেন গৃহপালিত প্রধানমন্ত্রী?
এনা, নিউইয়র্ক
কে হচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী? আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ না আমির হোসেন আমু? বিএনপি নেতা খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন নাকি সাইফুর রহমান? এ নিয়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগে চলছে তুমুল লবিং। শেখ হাসিনা অথবা খালেদা জিয়ার আশীর্বাদ যিনি পাবেন তাঁরই কপাল খুলে যাবে। পরবর্তী জাতীয় ‘গৃহপালিত প্রধানমন্ত্রী’র তিলক জুটে যাবে তাঁরই কপালে। প্রবাসে এ গুঞ্জনে এখন চায়ের টেবিল গরম।
টেবিলে টেবিলে বলা হচ্ছেÑ ডিসেম্বরে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা তা যদি সত্যি সত্যি হয়ে যায়, তাহলে সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রীর একজনও অংশ নিতে পারছেন না। তবে সে নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন কে কে পাবেন সেটি চূড়ান্ত করা হবে নেত্রীদের অনুমোদনক্রমেই। দল ও সরকারের বিশেষ একটি মহল এ ব্যাপারে সক্রিয় রয়েছে বলে আলোচনায় বলা হচ্ছে। অনেকের ধারণা, এবারের নির্বাচনে কোন দল বা জোটের কে মনোনয়ন পাবেন এবং কে জয়ী হবেন সবটাই পূর্বাহ্ণে ঠিক করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, অনুগত প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিপরিষদের সম্ভাব্য সদস্যদের তালিকাও আগে থেকেই করা হচ্ছে।
আমেরিকায় বাস করলেও বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে সদা তৎপর এমন কিছু পেশাজীবী বলেছেন, নব্বইয়ের পটপরিবর্তনের কয়েক বছর পর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যেভাবে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদকে প্রেসিডেন্ট পদে নিয়োগ করেছিলেন, প্রায় একই পরিস্থিতি এবারও সবাই প্রত্যক্ষ করবেন। অনুগত সংসদ নেত্রী এমন একজনকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ করার প্রস্তাব পেশ করবেন যাঁর ব্যাপারে সংসদ সদস্যদের অধিকাংশেরই কোনো আপত্তি উঠবে না। সংশ্লিষ্টরা যুক্তি দেখাবেন যে, প্রস্তাবিত ব্যক্তিটি দেশাত্মবোধের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং ব্যক্তিগতভাবে সততার নজিরও স্থাপন করেছেন পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময়। অবশ্য এভাবেই অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে রাজনীতিতে পুনর্বাসনের জোরদার একটি প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। প্যারলে কারামুক্তির পর চিকিৎসার জন্য আমেরিকায় আসার দীর্ঘদিন পর ১২ অক্টোবর শেখ হাসিনা বেলজিয়ামে প্রবাসীদের সমাবেশে বলেছেন, ‘ব্যক্তি বিশেষের উচ্চাভিলাষ দেশ ও জাতিকে অনেক সময় ধ্বংস করে দেয়। কারও যদি রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ থাকে তবে তাঁকে জনগণের কাতারে গিয়ে দাঁড়াতে হবে এবং জনগণের ম্যান্ডেট নিয়েই ক্ষমতায় যেতে হবে।’
হঠাৎ করে শেখ হাসিনার মুখে কঠিন একটি সত্য প্রকাশিত হয়েছে মূলত গৃহপালিত বা একান্ত বাধ্যগত প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত ‘প্রেসিডেন্ট’কে কেন্দ্র করেÑ এ ব্যাপারে প্রায় সবাই একমত। এমন কঠোর মন্তব্য প্রদানের উপযোগী সময় এটা কি না তা রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অনুধাবনে সক্ষম না হলেও কথাটি যে বলা উচিত ছিল তা নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া যেহেতু এখনো দেশেই রয়েছেন, সেজন্য অনেকে তাঁকে সাহসী নেত্রী হিসেবে মনে করছেন। যদিও তিনি এসব পরিস্থিতির আলোকে এখন পর্যন্ত তেমন উচ্চবাচ্য করতে পারেননি। এ সুযোগটি নিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এমন মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া হিসেবে তাঁর ভাগ্যে কী ঘটতে পারে তা ভবিতব্যই বলবে।
ঢাকার বিভিন্ন সূত্র উল্লেখ করেছে যে, বিচারিক প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সমন্বয় সাধনের জন্য তড়িঘড়ি করে যাঁদের জামিন দেয়া হয়েছে তাঁদের প্রায় সবাই ‘একান্ত বাধ্যগত’ হিসেবে অঙ্গীকার করেছেন। তাঁদের অনেকেই অসুস্থতাসহ নানা অজুহাতে নির্বাচন থেকে সরে থাকতে পারেন। আর যাঁরা নির্বাচনে লড়বেন তাঁরা জয়ী হয়ে ‘গৃহপালিত সংসদ সদস্য’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন যাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
সমঝোতার ফ্রন্ট লাইনে অবস্থানরতদের অন্যতম হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগের আমির হোসেন আমু, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও তোফায়েল আহমেদ নানা কৌশলে এগুচ্ছেন। তাঁদের আকাক্সক্ষা পূরণের অভিপ্রায়ে সভানেত্রী শেখ হাসিনার আশীর্বাদের বিকল্প নেই বলে মনে করছেন। এ জন্য ভেতরে ভেতরে নানা ফন্দি আঁটা হয়েছে। তোফায়েল আহমেদ সাংগঠনিক বিভিন্ন কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকায় আমেরিকা কিংবা যুক্তরাজ্যে এসে সভানেত্রীর সঙ্গে বৈঠক করার ফুরসত পাননি। এ অবস্থায় আমু এবং সেনগুপ্ত লন্ডন, বেলজিয়াম, ইতালি সফর করলেন। ঢাকা থেকে ফ্লাই করার আগে এ দুজন মিডিয়ায় প্রচারও পেয়েছেন। লন্ডনে লর্ডস সভার আয়োজনে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর সেমিনারের মূল বক্তা শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁরাও বক্তব্য রাখবেন বলে মিডিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু সেটি ঘটেনি। লন্ডনের একজন ব্যবসায়ীর ফ্ল্যাটে এ দুই নেতা বসে মহাপ্রতীক্ষায় ছিলেন, কিন্তু ডাক পড়েনি সভানেত্রীর পক্ষ থেকে। এমনকি তাঁরা ফোন করলে তাও ধরেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এমন বিব্রতকর অবস্থায় টানা ১১ দিন লন্ডন, ইতালি এবং বেলজিয়ামে কাটিয়ে ১৫ অক্টোবর তাঁরা ফিরে গেলেন ঢাকায়। তবে লন্ডন থেকে কানাডার উদ্দেশে ফ্লাই করার প্রাক্কালে শেখ হাসিনার সঙ্গে নাকি দীর্ঘ ৩০ মিনিট ফোনে আমির হোসেন আমুর কথা হয়েছে। সে সময়ে নানা বিষয়ে কথা হলেও আওয়ামী লীগ পরিচালনায় কোনো দিকনির্দেশনা জনাব আমুকে দেয়া হয়েছে বলে কেউ নিশ্চিত করতে পারেননি। ফলে যে মিশন নিয়ে আমু-সুরঞ্জিত লন্ডনে এসেছিলেন তা পুরোপুরি ব্যর্থ হওয়ায় ‘একান্ত বাধ্যগত’ সংসদের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগ্রহটি মাঠে মারা গেল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বর্তমান ধারাক্রম যদি অব্যাহত থাকে তবে তোফায়েল আহমেদের ভাগ্য প্রসন্ন হতে পারে বলেও অনেকে মনে করছেন।
অপরদিকে বিএনপিতেও জোর লবিং চলছে দেশ-বিদেশে। সংগঠনের চরম দুর্দিনে বিএনপির হাল সঠিকভাবে ধরে চেয়ারপারসনসহ ত্যাগি নেতাকর্মীদের প্রশংসা লাভে সক্ষম মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের নাম শোনা যাচ্ছে স্বল্পকালীন সংসদের প্রধান অথবা বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে। পাশাপাশি ‘ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসা’ সাইফুর রহমানও উঠে পড়ে লেগেছেন চেয়ারপারসনের মন জয়ে। অনুগত সংসদের প্রধান অথবা বিরোধীদলীয় প্রধান হওয়ার জন্য তিনি এখন এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত হচ্ছেন না যা দিয়ে বেগম জিয়াকে সন্তুষ্ট করা যায়। যদিও বেগম জিয়া কারাগারে থাকাবস্থায় সাইফুর রহমানের ভূমিকা এখন পর্যন্ত কারও মন থেকে মুছে যায়নি। এ ছাড়া সিলেট অঞ্চলে তাঁর পুত্রদের কাহিনীও মিডিয়ার পাতা থেকে দূরীভূত হয়নি। তবে রাজনৈতিক দুরদর্শিতাসম্পন্ন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রিন সিগন্যাল দেননি সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ব্যাপারে এবং সমঝোতার ব্যাপারেও। কারামুক্তির মাধ্যমে নিজের নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারটি অনিশ্চিত হয়ে পড়লেও তিনি চাচ্ছেন দলের ত্যাগি নেতাদের সামনে নেয়ার। তাঁর ধারণা, এ পরিস্থিতি কেটে যাবে শিগগিরই।
প্রধান দুই দলের সঙ্গে সরকারের নেপথ্য যোগাযোগ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জেনারেল এরশাদ, ড. কামাল হোসেন এবং ডা. বি চৌধুরীর সঙ্গেও সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ রাখতে পিছপা হচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা। আলোচনার টেবিলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ড. কামাল হোসেনের নামও কখনো কখনো আসছে। এ জন্য তাঁকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটে ঢুকানোর একটি প্রক্রিয়া সরকারের তরফ থেকে এখন পর্যন্ত সক্রিয় রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট কে হবেন তা নির্ধারণের ব্যাপারে অন্য কাউকে দায়িত্ব দিচ্ছে না নীতি-নির্ধারকরা। এ ছাড়া বিএনপি এবং আওয়ামী লীগসহ অন্য সবাই যেন ব্যাপারটি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েই রয়েছেন। এ জন্যই কী বেলজিয়ামে শেখ হাসিনা অমন আচমকা বক্তব্য রেখেছেন?
এমন আরো কিছু পোষ্ট:
- ক্ষমতায় গেলে এ সরকারের সব কাজের বৈধতা দেয়া হবে ॥ সাংবাদিকদের আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক
- প্রার্থী হবেন না দুই নেত্রী!
- চোরের বংশধর প্রধানমন্ত্রী!
- ১৮ বছরের রেকর্ড ভঙ্গ করলেন ড. ফখরুদ্দীন
- মোটা হচ্ছেন কেন?
- আবার আওয়ামী লীগের জোটে ফিরতে চান ড. কামাল
- বাড়ছে মতের দূরত্ব প্রবীণরা হচ্ছেন নি:স্ব
- ফের তিনি বাবা হচ্ছেন
- চারদিকে নির্বাচন পেছানোর জোর গুজব
- ‘এরশাদ ইজ নট মাইনাস ভেরি মাচ প্লাস’
You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0 feed. You can leave a response, or trackback from your own site.
