প্লেটো (খ্রিস্টপূর্ব ৪২৪-খ্রিস্টপূর্ব ৩৪৭)

 প্লেটো (খ্রিস্টপূর্ব ৪২৪ খ্রিস্টপূর্ব ৩৪৭)প্লেটো ছিলেন সেই সব সীমিত সংখ্যক মানুষের একজন, যারা ঈশ্বরের অকৃপণ করুণা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেনÑ তার জন্ম হয়েছিল সম্ভ্রান্ত ধনী পরিবারে। অপরূপ ছিল তার দেহ লাবণ্য, সুমিষ্ট কণ্ঠস্বর, অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞানের প্রতি আকাক্সক্ষা, সক্রেটিসের মতো গুরুর শিষ্যত্ব লাভ করা, সবকিছুতেই তিনি ছিলেন সৌভাগ্যবান।
প্লেটো বিভিন্ন শিক্ষকের কাছে শিক্ষা লাভ করেছেন। তাদের কারোর কাছে শিখেছেন সঙ্গীত, কারো কাছে শিল্প, কেউ শিখিয়েছেন সাহিত্য আবার কারো কাছে পাঠ নিয়েছেন বিজ্ঞানের। সক্রেটিসের প্রতি ছেলেবেলা থেকেই ছিল প্লেটোর গভীর শ্রদ্ধা। সক্রেটিসের জ্ঞান, তার শিক্ষাদানের পদ্ধতির প্রতি কিশোর বয়সেই আকর্ষণ অনুভব করেছিলেন। কুড়ি বছর বয়সে তিনি সক্রেটিসের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।
তরুণ প্লেটো অল্পদিনের মধ্যেই হয়ে উঠলেন সক্রেটিসের সবচেয়ে প্রিয় শিষ্য। গুরুর বিপদের মুহূর্তেও প্লেটো ছিলেন তার নিত্যসঙ্গী। প্লেটো শুধুই যে সক্রেটিসের প্রিয় শিষ্য ছিলেন তাই নয়, তিনি ছিলেন গুরুর জ্ঞানের ধারক-বাহক।
গুরুর প্রতি এতো গভীর শ্রদ্ধা খুব কম শিষ্যের মধ্যেই দেখা যায়। প্লেটো যা কিছু লিখেছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার প্রধান নায়ক সক্রেটিস। এর ফলে উত্তরকালের মানুষদের কাছে একটা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। সক্রেটিসকে কেন্দ্র করে প্লেটো তার সব সংলাপ তত্ত্বকথা প্রকাশ করেছেন। সব সময়েই প্লেটো নিজেকে আড়ালে রেখেছেনÑ কখনোই প্রকাশ করেননি। সক্রেটিসের জীবনের অন্তিম পর্যায়ের যে অসাধারণ বর্ণনা করেছেন প্লেটো তার ‘সক্রেটিসের জীবনের শেষ দিন’ গ্রন্থে, জাগতে তার কোনো তুলনা নেই।
গুরুর মৃত্যুতে গভীরভাবে মর্মাহত হয়েছিলেন প্লেটো। এর কয়েক বছরের মধ্যেই এথেন্স স্পার্টার হাতে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হলো। আর এথেন্সে থাকা নিরাপদ নয় মনে করে বেরিয়ে পড়লেন। তিনি যখন যে দেশেই গেছেন সেখানকার জ্ঞানী-গুণী-প-িতদের সঙ্গে নানা বিষয়ে আলোচনা করতেন। এতে একদিন যেমন তার দৃষ্টিভঙ্গি, জ্ঞানের প্রসার ঘটছিল, অন্যদিকে তেমনি প-িত দার্শনিক হিসেবে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে।
তার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, সিসিলি দ্বীপের শাসকদের আহ্বানে তিনি উপদেষ্টা হিসেবে সেখানে যান। তিনি চেয়েছিলেন সিসিলিকে এক আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে গঠন করতে। দার্শনিকদের চিন্তাভাবনার সঙ্গে রাষ্ট্রনেতাদের চিন্তাভাবনার কোনোদিনই মিল হয় না। তাই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে এলেন এথেন্সে। তার এ অভিজ্ঞতার আলোকে লিখলেন ‘রিপাবলিক’Ñ এক আদর্শ রাষ্ট্রের রূপ ফুটে উঠেছে সেখানে।
আসলে প্লেটোর আগে দর্শনশাস্ত্রের কোনো শৃঙ্খলা ছিল না। তিনিই তাকে একটি সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করলেন। তাকে নতুন ব্যঞ্জনা দিলেন। তিনি জীবনব্যাপী সাধনার মধ্যে দিয়ে মানুষকে দিয়েছেন এক নতুন প্রজ্ঞার আলো।
তিনি বিশ্বাস করতেন রাষ্ট্রক্ষমতায় কোনো স্বৈরাচারীর স্থান নেই। ‘রাষ্ট্রের অস্তিত্ব শুধু জীবনধারণের জন্য নয়। যতোদিন মানুষ জীবিত থাকবে, ততোদিনই সে শ্রেষ্ঠ জীবনযাপন করবে।’ তার রাষ্ট্রব্যবস্থায় উঁচু-নিচুর ভেদ থাকবে না, থাকবে পারস্পরিক সৌহার্দ ও প্রীতির সম্পর্ক। দী লস গ্রন্থের এক জায়গায় তিনি বলেছেন, নগরবাসীরা পরস্পরকে জানবে, বুঝবে। এর চেয়ে ভালো ব্যবস্থা রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আর কিছুই হতে পারে না।
সুপ্রজনন বিজ্ঞানÑ প্রাচীন গ্রিসের মানুষেরা সুস্থ সবল দেহের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতো। তারা দুর্বল অসুস্থ শিশুকে জীবিত রাখার পক্ষপাতী ছিলেন না। প্লেটো এ অভিমত সমর্থন করতেন। তাই তিনি বলেছেন, যাদের শরীর ব্যাধিগ্রস্ত তাদের কোনো সন্তান প্রজনন করা উচিত নয়। আপাতত দৃষ্টিতে প্লেটোর অভিমত নিষ্ঠুর বলে মনে হলেও সামাজিক বিচারে তা একেবারে মূল্যহীন নয়।
সঙ্গীতের প্রতি প্লেটোর ছিল গভীর আকর্ষণ। তিনি বিশ্বাস করতেন সঙ্গীত মানবজীবনকে পূর্ণতা দেয়, মানবিক গুণকে বিকশিত করে।
নারীদের প্রতি প্লেটোর ছিল গভীর শ্রদ্ধা। তাদের শিক্ষা সম্পর্কে তিনি উদার নীতিতে বিশ্বাস করতেন। তিনি মনে করতেন, পুরুষেরা অহমিকাবশত নারীদের উপেক্ষা করে। তিনি দেখেছেন বিভিন্ন গ্রিক মনীষীর প্রেরণার উৎসই হচ্ছে নারী।
প্লেটো তার সব শিক্ষার মধ্যে দিয়ে এক আদর্শ রাষ্ট্র, মানবসমাজ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। জীবনের অন্তিম পর্বে এসে বাস্তবের ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে উপলব্ধি করেছিলেন, রিপাবলিকের মধ্যে তিনি যে রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছেন, তা কোনোদিনই বাস্তব হওয়া সম্ভব নয়। তাই তিনি লিখলেন তার ‘আইন’ (খধংি) গ্রন্থ। এতে মানুষের বাস্তব প্রয়োজন, তার কল্যাণের কথা চিন্তা করে রাষ্ট্রের আদর্শের কথা বলেছেন।
দার্শনিক প্লেটোর আরেক দিক তার কবিসত্তা। তার প্রবন্ধগুলোর মধ্যে একদিকে যেমন প্রকাশ পেয়েছে জ্ঞান, গভীরতা, প্রজ্ঞা… অন্যদিকে ফুটে উঠেছে অনুপম লালিত্য। দর্শনের ভাষা যে এমন প্রাণবন্ত, কাব্য সৌন্দর্যে অতুলনীয় হয়ে উঠতে পারে, প্লেটোর রচনা না পড়লে তা অনুভব করা যায় না।
প্লেটো ছিলেন একেশ্বরবাদী। তার ঈশ্বর মঙ্গলময়, তিনি মানুষের কল্যাণ করেন। তিনি পূজা পাঠ উপাসনাকে স্বীকার করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন শ্রদ্ধা আর পবিত্র চরিত্র। সেসঙ্গে প্রজ্ঞা, জ্ঞানের মাধ্যমেই ঈশ্বরের পূজা করতে হয়।
একদিন তার এক বন্ধুর ছেলের বিয়েতে নিমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলেন। সেখানকার কলকোলাহলে কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। বিশ্রাম নেয়ার জন্য পাশের ঘরে গেলেন; কিন্তু আনন্দ-উল্লাসের শব্দ ক্রমেই বেড়ে চলছিল। উপস্থিত সবাই ভুলে গিয়েছিল বৃদ্ধ দার্শনিকের কথা।
এক সময় বিয়ে শেষ হলো। নবদম্পতি আশীর্বাদ নেয়ার জন্য প্লেটোর কক্ষে গেলো। প্লেটো তখন গভীর ঘুমে অচেতন। পৃথিবীর কোনো মানুষের ডাকে সে ঘুম আর কখনো ভাঙবে না।

খবরটি পড়েছেন :401
  • Print
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Google Bookmarks
  • email
  • LinkedIn
  • Twitter
  • Add to favorites
  • StumbleUpon
  • PDF

এমন আরো কিছু পোষ্ট:

  1. খ্রিস্টপূর্ব দশম শতাব্দীর নারী কঙ্কাল

You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0 feed. You can leave a response, or trackback from your own site.

Leave a Reply

XHTML: You can use these tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>