ঝাঁকঝাঁক ডলফিন আর তিমির মেলা
ঝাঁকঝাঁক ডলফিন আর বিশাল আকারের তিমি। তাদের ঘিরে আরোও একঝাঁক স্তন্যপায়ী, তবে তারা জলের নয়, স্থলের। বাবা-মায়ের সঙ্গে তারা জলের স্তন্যপায়ীদের দেখতে এসে মেতে উঠেছে পরমানন্দে। স্থান- শিশু একাডেমী। সেখানেই চলছে দেশের প্রথম শুশুক মেলা। বাংলাদেশ জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণীবৈচিত্র প্রকল্প নামের একটি বেসরকরী গবেষণা সংস্থা গত বৃহস্পতিবার থেকে আয়োজন করছে চার দিনের এই মেলা। চলবে আগামী রবিবার পর্যন্ত। শুক্রবার ছুটির দিনে সারাবেলাই দর্শক সমাগম ছিল যথেষ্ট, তবে বিকাল থেকে একাডেমী প্রাঙ্গণ মুখর হয়ে উঠেছিল বাবা মায়েদের সঙ্গে আসা শিশু-কিশোরদের সানন্দ পদচারনায়। সকাল সাড়ে ন’টা থেকে শুরু হচ্ছে মেলার কাজ চলছে রাত সাড়ে আটটা অবধি।
আমাদের দেশে আছে দুধরনের ডলফিন। মিঠাপানি অর্থাৎ নদ-নদীতে রয়েছে লম্বা ঠোঁটওয়ালা গাঙ্গেয় ডলফিন। এই ঠোঁটের সামনের দিকে রয়েছে দাঁতের সারি। মাছই সবধরণের ডলফিনের প্রধান খাদ্য। এই গাঙ্গেয় ডলফিনরা আবার চোখে বিশেষ দেখে না। অন্ধই বলা যায়। শিকার ধরা ও বিপদ আপদ বোঝার কাজটি তারা করে শ্রুতির মাধ্যমে। এক ধরণের বিশেষ শব্দ তরঙ্গ তারা সৃষ্টি করে। এই শব্দ আশপাশের বস্তুতে লেগে তাদের কাছে ফেরত আসে। এ থেকেই তারা বস্তুটি কেমন ও তার অবস্থান নির্ণয় করে। শুধু এই ডলফিন গুলোই নয়, সবরকমের স্তন্যপায়ী জলজ প্রাণীরই আমাদের মতো মানুষের যেমন নিশ্বাস প্রশ্বাস নেয়ার জন্য বাতাসের দরকার হয় তেমনি তাদেরও। এ কারণেই তিমি বা ডলফিনকে পানির তলা থেকে খানিক পরপরই উপরে উঠে এসে নাক ভাসাতে বা লাফিয়ে উঠতে হয়। আমদের কাছে দেখতে চমৎকার লাগে দৃশ্যটি। যদিও মাত্রই কয়েক সেকেন্ডের দৃশ্য তবু কতই না চমৎকার দেখায় সেই জলকেলির মুহুর্তটি। হাতে ক্যামেরা থাকলে তো কথাই নেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠেন সকলেই মুহুর্তটিকে স্থায়ীভাবে ধরে রাখতে।
তবে দুঃখের খবর হলো সেই সুযোগটি দিনে দিনে কমে আসছে অতি দ্রুত। যাক এতক্ষণ ধরে বলা হলো গাঙ্গেয় ডলফিন সাধারণ মানুষের কাছে কিন্তু তার পরিচিতি ‘শুশুক’ নামেই। একটা সময় ছিল যখন আমাদের এই নদীমাতৃক দেশের হেন কোন নদ-নদী ছিল না যেখানে মাঝে মাঝেই শুশুকদের এই ডুবডুব জলকেলি দেখা যেত না। অথচ এখন এমন দৃশ্য বিরল। শুশুকদের যে স্বভাব বদলে গেছে বিষয়টি মোটেই তেমন নয়, বরং তাদের সংখ্যাই গেছে মারাত্মকভাবে কমে। অথচ এই জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণীটির পর্যাপ্ত পরিমানে টিকে থাকা নদ-নদীর স্বাস্থ্যের জন্যই অতীব জরুরী। আর নদ-নদী যে আমাদের নদীমাতৃক কৃষিপ্রধান দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ এবং সামগ্রিকভাবে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যও অনিবার্য প্রয়োজন তা বলারই অপেক্ষা রাখে না। এই পরিস্থিতিতে কেন শুশুকের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ছে, তাদের রক্ষা করা কেন প্রয়োজন, কী করণীয় রয়েছে আমাদের এসব বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তুলতেই এই মেলার আয়োজন করা হয়েছে বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণীবৈচিত্র প্রকল্প বিসিডিটি’র গবেষক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সমন্বয়কারী এলিজাবেথ ফার্নি মনসুর জানালেন, ২০০৬ সাল থেকে তারা বাংলাদেশের মিঠাপানির ডলফিন অর্থাৎ শুশুক ও সামুদ্রিক ডলফিন ও তিমি নিয়ে গবেষণা ও জরিপের কাজ করছেন। শুশুক বিশেষজ্ঞ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক বেনজির আহমদ কাজ করছেন প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে। সঙ্গে আছেন ব্রায়ান ডি স্মিথ, রুবাইয়াত মনসুর সহ এক দল গবেষক।
এলিজাবেথ জানালেন আমাদের দেশের সমুদ্র সীমায় বিশেষ করে সুন্দরবন উপকূলে ছ’রকমের ডলফিন ও এক ‘ব্রিডিস তিমি’ নামের এক রকমের তিমির বসবাস রয়েছে। ডলফিন গুলো হলো-‘গোলাপী ডলফিন’, ‘ইরাবতি ডলফিন’,‘ফিনলেস ডলফিন’, ‘ স্পিনার ডলফিন’,‘স্পটেড ডলফিন’ ও ‘বলটনোস ডলফিন’। আমাদের দেশের নদ-নদী ও সমুদ্র উপকূল এসব জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বসবাসের জন্য বিশ্বের অন্যতম প্রধান উপযোগী এলকা বলে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীরা এই অঞ্চলকে এসব প্রাণীর জন্য ‘হটস্পট’ হিসাবে সনাক্ত করেছেন। বিশ্বে মিঠাপানির ডলফিন রয়েছে কেবল মাত্র আমাদের দেশে। গাঙ্গেয় ডলফিন এবং আমাজান নদীতে ‘বেডো ডলফিন’ এছাড়া চীনের জিয়াংমি নদীতে ছিল বেইজি ডলফিন যা এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তবে দুঃখজনক ঘটনা হলো আমাদের দেশেও শুশুক এত কমে গেছে যে এখন থেকেই তাদের সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে না পারলে বিলুপ্ত হওয়ার আশংকা রয়েছে তাদের।
শুশুক মারা যাচ্ছে প্রধানত নদ-নদীর পানি ব্যাপক হারে দুষণ কবলিত হওয়া, নদ-নদী দখল এবং জেলেদের জালে আটকা পড়ে। কারেন্ট বা ফাঁস জালের মতো ক্ষুদ্র ছিদ্র যুক্ত জালে শুশুক আটকে গেলে তারা আর উপরে উঠতে পারে না। দীর্ঘ সময় পানির তলায় থাকলে আমাদের মানুষের মতোই এই প্রাণীগুলো দমবন্ধ হয়ে অত্যন্ত কষ্টে মারা যায়। সমুদ্রেও একই অবস্থা। সেখানেও রয়েছে দুষণ। রয়েছে জালে আটকে পড়ার ঘটনা। অনেক সময় দেখা গেছে জালে ডলফিনের ঠোট বা পাখনা আটকে পড়েলে তা কেটে জাল রক্ষা করতেই আগ্রহী হয়ে থাকে জেলেরা।
অথচ পাখনা কাটা প্রাণীটি যে এতে মরে যাবে সেদিকে তাদের খেয়ালই থাকে না। তাদের হয়তো এমন করে বোঝানোই হয়নি যে পাখনা কাটলে নিরীহ এই প্রণীটি আর বাঁচবে না অথচ জাল কেটে তাকে পানিতে ছেড়ে দিলে সে প্রাণে বেঁচে যাবে এবং জালটিও পরে মেরামত করে নেয়া যাবে। এসব সচেতনতার অভাবেই আমাদের দেশের জলজ স্তন্যপায়ী প্রণীর অস্তিত্ব আজ হুমকীর মুখে পড়ে গেছে।
শুশুক মেলায় দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে ডলফিন ও তিমির হরেক রকমের আলোকচিত্র, বড়বড় ডিজিটাল প্রিন্টের বোর্ডে সচিত্র বিস্তারিত তথ্যমালা। ভিডিও ও প্রামান্য চিত্র প্রদর্শনী, তিমি ও ডলফিনের ডামি, অস্থির প্রদর্শনী এবং ক্ষুদে দর্শকদের জন্য মজার মজার কুইজ ও খেলা। মেলার এসব তথ্য উপাত্ত ও আলোকচিত্রের প্রদর্শনীর অংশটি চলছে একাডেমীর শিশু গ্রন্থভবনের দোতলায়। প্রধান মিলনায়তনে চলছে প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় ‘শুশুক, নদী এবং আমরা’ ও ‘এক্সপ্লোরিং আওয়ার ওয়াটার’ নামের দুটি প্রামান্য চিত্রের প্রদর্শনী।
এর নির্মাতা হলেন তানজিলুর রহমান। দেশের জীব বৈচিত্র রক্ষাকরার দায়িত্ব আমাদের সকলেরই এবং তা আমাদের অস্তিত্ব ও আগামী প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজন। সেকাজে যারাই উদ্যোগী হবেন তাদের জন্য সাধুবাদ সবসময়ের জন্য থাকবে সকলের পক্ষ থেকেই।
number of view: 1270এমন আরো কিছু পোষ্ট:
You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0 feed. You can leave a response, or trackback from your own site.
