মনিপুরী সাহিত্য : অনুদঘাটিত এক গোপন ঐশ্বর্য

এ কে শেরাম
ম ঙ্গোলীয় মহাজাতির তিব্বত-ব্রহ্ম শাখার কুকি-চীন গোষ্ঠীর অন্তর্গত মনিপুরী জাতি। অভ্যন্তরীণ কলহ এবং যুদ্ধ-বিগ্রহজনিত নানা কারণে মনিপুরী জনগণ বিভিন্ন সময়ে তাদের আদি আবাসস্খল মনিপুর রাজ্য ছেড়ে বাংলার শ্যামল কোমল প্রান্তরে এসে বসতি স্খাপন করেছিল আজ থেকে প্রায় আড়াই শ’/তিন শ’ বছর আগে। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল ছাড়াও তখন ঢাকার তেজগাঁও, ময়মনসিংহের দুর্গাপুর এবং কুমিল্লার কসবা অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল মনিপুরী বসতি। কিন্তু কালিক বিবর্তনের ধারায় ক্রমে ক্রমে বিলুপ্ত হয়ে গেছে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লার মনিপুরী বসতি। আজ কেবল বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের নানা স্খানেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে মনিপুরী জনগণ।
সংখ্যাস্বল্পতা এবং নানাবিধ কারণেই বাংলাদেশে মনিপুরীরা সব সময়ই অনালোচিত থেকে গেছে অনুদঘাটিত থেকে গেছে মনিপুরী সাহিত্য-সংস্কৃতির ঐশ্বর্যমণ্ডিত ভাণ্ডার। অথচ মনিপুরীরা জাতিসত্তা হিসেবে এক সমৃদ্ধ ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির গৌরবময় এবং দীর্ঘ ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ধারণ করে আছে। মনিপুরী সাহিত্যের অনুদঘাটিত এই গোপন ঐশ্বর্যকে জনসমক্ষে তুলে ধরার প্রয়াসেই বক্ষ্যমাণ এই নিবìধ।
মনিপুরী লিপি
মনিপুরীদের নিজস্ব লিপি রয়েছে। খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকে মনিপুররাজ পাখংবা এই লিপির উদ্ভাবন করেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ মেলে। তখন এর সংখ্যা ছিল ১৮। পরে সপ্তদশ শতাব্দীতে মহারাজা খাগেম্বা কর্তৃক আরো কিছু বর্ণ সংযোজিত হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে মহারাজ গরিব নেওয়াজের শাসনামলে হিন্দু ধর্মের ব্যাপক বিস্তৃতি লাভের প্রেক্ষাপটে মনিপুরী লিপির স্খান গ্রহণ করে বাংলা লিপি, সেই থেকেই মনিপুরী ভাষা বাংলা লিপিতেই লিখিত হয়ে আসছে। অবশ্য বর্তমানে প্রাচীন মনিপুরী লিপি পুন:প্রবর্তনের চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রচুর বিতর্ক সত্ত্বেও সাধারণভাবে বিশ্বাস করা হয়ে থাকে যে, মনিপুরী লিপি ব্রাহ্মী লিপি থেকে উদ্ভূত। মনিপুরী লিপির অনুপম বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রতিটি বর্ণমালার নামকরণ দেহের এক একটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নামানুসারে এবং এর গঠনও সংশ্লিষ্ট ওই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গঠন প্রকৃতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ বলা চলে বাংলা ‘ক’-এর মনিপুরী প্রতিবর্ণের নাম ‘কোক’ যার বাংলা অর্থ মাথা। এমনি করে বাংলা ‘স’-এর মনিপুরী প্রতিবর্ণ হলো ‘সম’ যার অর্থ চুল এবং বাংলা ‘ম’-এর মনিপুরী প্রতিবর্ণ ‘মিৎ’ যার অর্থ চোখ ইত্যাদি। মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নামানুসারে মনিপুরী বর্ণমালার নামকরণ এক অনন্য নিদর্শন এবং সম্ভবত পৃথিবীতে নজিরবিহীন।
মনিপুরী ভাষা ও সাহিত্য ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
মনিপুরী ভাষা ও সাহিত্য অত্যন্ত প্রাচীন। এর ইতিহাস ও ঐতিহ্য সুদীর্ঘ এবং সমৃদ্ধ। উৎস বিচারে মনিপুরী ভাষা মঙ্গোলীয় মহাপরিবারের তিব্বত-ব্রহ্ম শাখার কুকি-চীন গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। পণ্ডিতরাজ অতোম্বাপু শর্মা, যাকে ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় প্রাচ্যের ঋষি অগস্ত্য বলে অভিহিত করেছেন, তার মতে ‘মৈতৈ’ বা মনিপুরী ভাষার বয়স অন্যূন ৩ হাজার ৪০০ বছর এবং প্রাচীনতার দিক থেকে মনিপুরী সাহিত্যের স্খান ভারতের প্রাচীনতম সাহিত্য কৃষä-যজুর্বেদের পরই। উল্লেখ্য, বর্তমানে যারা মনিপুরী নামে পরিচিত, বা মনিপুরী ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বলতে যে ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বোঝানো হয়ে থাকে উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ পর্যন্ত তা মৈতৈ জাতি বা মৈতৈ ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নামে পরিচিত ছিল। মনিপুরে হিন্দু ধর্মের ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের পরিপ্রেক্ষিতে একজন হিন্দু ধর্মপ্রচারক অষ্টাদশ শতাব্দীতে মহাভারতোক্ত মনিপুরের সাথে যোগসূত্র আবিষ্কার করে ‘মৈত্রবাক’ নামে পরিচিত এ রাজ্যের নতুন নামকরণ করেন ‘মনিপুর’ এবং অধিবাসীদের নাম দেন ‘মনিপুরী’। মনিপুরে ব্রিটিশ আগমন সূচিত হলে ‘মনিপুর’ নামটি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং ‘মৈতৈ’ শব্দের পরিবর্তে ‘মনিপুর’ শব্দের ব্যবহার শুরু হয়। পরে ১৮৯১ সালে স্বাধীন মনিপুর রাজ্য ব্রিটিশদের করতলগত হওয়ার পর পুরোপুরিভাবেই ‘মৈতৈ’ শব্দের স্খান গ্রহণ করে ‘মনিপুরী’। তবে এ ক্ষেত্রে মনিপুরী শব্দটি ব্যবহৃত হয় নৃতাত্ত্বিক পরিচিতিসূচক ‘মৈতৈ’ শব্দের সমার্থক শব্দ হিসেবে। মনিপুরী ভাষা বা ‘মৈতৈলোন’ হাজার বছর ধরে ভারতের মনিপুর রাজ্যের রাজ্যভাষা এবং সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ পর্যন্ত শিক্ষাদানের মাধ্যম হিসেবে প্রচলিত হয়ে এসেছে। এ ছাড়াও এ ভাষা বর্তমানে মনিপুর বিশ্ববিদ্যালয়, গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, নয়াদিল্লির সাহিত্য একাডেমি এবং মনিপুর, আসাম, দিল্লি, পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত। আকাশবাণী ইস্ফালসহ আকাশবাণীর বিভিন্ন কেন্দ্রের মনিপুরী অনুষ্ঠানের প্রচারমাধ্যমও মনিপুরী ভাষা তথা এই মৈতৈলোন। তা ছাড়া ১৯৯২ সালে ভারত সরকার মনিপুরী ভাষাকে ভারতীয় সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ভারতের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
বিজ্ঞজনরা মনিপুরী সাহিত্যচর্চার ধারাকে চারটি কালানুক্রমিক ধারায় বিভক্ত করার পক্ষপাতী। প্রাচীন যুগ-১০৭৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত, প্রাচীন মধ্যযুগ-১০৭৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৭০৯ খ্রিষ্টাব্দ, নবীন মধ্যযুগ- ১৭১০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দ এবং ১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে পরবর্তী সময়কালকে মনিপুরী সাহিত্যের আধুনিক কাল বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে আমরা আলোচনার সুবিধার্থে মনিপুরী সাহিত্যের পুরো সময়কালকে মোটা দাগে দুটো ভাগে ভাগ করব প্রাচীনকাল ও আধুনিককাল।
প্রাচীনকাল
পৃথিবীতে কয়েক সহস্র ভাষা প্রচলিত। কিন্তু সব ভাষাতেই এখনো ফসলিত হয়ে ওঠেনি সাহিত্যের হিরন্ময় শস্য। কারণ, মুখের ভাষা সব ক্ষেত্রেই সাহিত্যের ভাষা হয়ে ওঠে না। একটি জাতির ভাষা দীর্ঘকালের পথপরিক্রমায় ঋদ্ধ হয়ে উঠলেই সেখানে পুষ্পিত হয়ে ওঠে সাহিত্যের কুসুমিত ফসল। মনিপুরীদের ক্ষেত্রে আমরা দেখি খ্রিষ্টীয় প্রথম শতাব্দী থেকেই মনিপুরী ভাষা এক উল্লেখযোগ্য সমৃদ্ধি অর্জন করে। ইতিহাস বলে, মনিরপুররাজ পাখংবা যখন ৩৩ খ্রিষ্টাব্দে সিংহাসনারোহণ করেন তখন সূর্যদেবতার উদ্দেশে নিবেদিত হয়েছিল, ‘ঔগ্রী হংগেল’ নামের এক ধরনের গীতিকবিতা। এই ঔগ্রী হংগেল রচনারীতি, আঙ্গিক বৈশিষ্ট্য এবং প্রায়োগিক দিক থেকে একমাত্র বৈদিক স্তোত্রের সাথেই তুলনীয়। তখনো অবশ্য মনিপুরী সাহিত্যের দিঙমণ্ডলে অভ্যুদ্বয় ঘটেনি লেখ্য সাহিত্যের। সপ্তম শতাব্দীর দিকে এসে আমরা প্রথম লিখিত মনিপুরী সাহিত্যের সìধান পাই। উল্লেখ্য, বিশ্বের অন্যতম এক উন্নত সাহিত্য-বাংলার আদিরূপ ‘চর্যাপদ’-এর জন্মকাল দশম শতাব্দী; আবার কারো কারো মতে, দ্বাদশ শতাব্দী। সুতরাং লক্ষণীয়, কালানুক্রমের বিচারে মনিপুরী সাহিত্য বাংলা সাহিত্যের চেয়েও কয়েক শতাব্দীর প্রাচীন। অষ্টম শতাব্দী থেকে শুরু করে দশম বা একাদশ শতাব্দীর দিকে এসে ‘মনিপুরী’ এক সাহিত্যিক ঋদ্ধি অর্জন করে। এই সময়কালেই জন্ম নেয় মনিপুরী সাহিত্যের অনেক উজ্জ্বল অলঙ্কার। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নুমিৎ কাপ্পা, পান্থোইবী খোংগুল, পোইরৈতোন খুনখোকপা, চৈথারোল কুম্বাবা, নিংথৌরোল লম্বুবা, চাদা লাইহুই, নিংথৌরোল শৈরেং, সানা লমওক প্রভৃতি। মনিপুরী সাহিত্যের এই বিভান্বিত স্রোতধারা নিতি নব সৃষ্টির আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে বহমান থাকে ষোড়শ বা সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত। এই স্বর্ণপ্রসূ সময়েই মনিপুরী সাহিত্যের অজিতির ভাণ্ডারে আরো যুক্ত হয় হিজন হিরাও, নাউথিংখোং ফম্বাল কাবা, খোংজোংনুবী নোঙ্গারোন, চায়নারোল, চোথে থাংওয়াই পাখংবা, নোংশামৈ, সমসোক ঙম্বা, চিংখখোম্বা গঙ্গা চৎপা এমনি অনেক দ্যুতিময় সৃষ্টির সম্ভার। কেবলমাত্র সৃষ্টির বহুবর্ণিল বৈচিত্র্যেই নয় গুণগত উৎকর্ষের বহুভঙ্গিম বৈশিষ্ট্যের কারণেও উপরোক্ত সময়কাল সৃষ্ট মনিপুরী সাহিত্য এক উল্লেখযোগ্য স্বাতন্ত্র্যে ভাস্বর হয়ে ওঠে। আমাদের প্রতিবেশী অনেক উন্নততর সাহিত্যে মধ্যযুগ বলে কথিত সেই পঞ্চদশ, ষোড়শ বা সপ্তদশ শতাব্দীতে রচিত সাহিত্যকর্মে যেখানে আমরা দেখি কেবলি ধর্মকেন্দ্রিকতা; বিভিন্ন দেব-দেবীই যেখানে কাহিনীর মুখ্য চরিত্র; যেখানে মানুষের, বিশেষত সাধারণ মানুষের উপস্খিতিই যখন নিছক কষ্টকল্পনা সেখানে সে সময়কার মনিপুরী সাহিত্যের নানা সৃষ্টির সম্ভারে আমরা সবিস্ময়ে লক্ষ করি মানুষেরই জয়গান, লক্ষ করি অতি সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের নানায়তনিক কাহিনীরই সুস্পষ্ট চিত্রায়ন।
উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে নুমিৎ কাপ্পা, হিজন হিরাও, পোইরেতোন খুনথোকপা প্রভৃতি গ্রন্থের কথা। নুমিৎ কাপ্পা কাব্যকাহিনীতে সূর্যদেবতার উৎপীড়নে বিক্ষুব্ধ খুয়াই নোংজেংবম বংশের প্রধান কর্তৃক গোপনে সূর্যের প্রতি তীর নিক্ষেপ করার কথা বিবৃত হয়েছে। অত:পর সেই ঘটনায় ভীতসন্ত্রস্ত্র সূর্য ভ্রাতৃদ্বয়ের পলায়ন এবং সূর্যের অনুপস্খিতিতে সৃষ্টি ধ্বংস হবে ভেবে সব বংশপ্রধান কর্তৃক সম্মিলিতভাবে অনুরোধ জানিয়ে সূর্যকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসার কথা আমরা এ গ্রন্থে পাই। এখানে সূর্যের প্রতীকে উপস্খাপিত হয়েছে রাজাকেই। অত্যাচারী রাজার বিরুদ্ধে সাধারণ প্রজাদের বিদ্রোহ এবং পরের রাজার নি:শর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে আবার রাজপদে অভিষিক্ত হওয়ার কাহিনীই নুমিৎকাপ্পা গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে, সেই সময়কালেই মনিপুরী সাহিত্যে আধুনিক প্রতীকীবাদের সুস্পষ্ট প্রকাশ যেমন ঘটেছিল, তেমনি রাজার বিরুদ্ধে সাধারণ প্রজাদের সফল বিদ্রোহের কাহিনীও বিবৃত হয়েছিল কাব্যিক ব্যঞ্জনায়। আবার হিজন হিরাও গ্রন্থে দেখা যায় ‘রোমান্টিসিজম’ ও ‘পারসোনাফিকেশন’-এর প্রকৃষ্ট প্রয়োগ। রাজকীয় নৌকা নির্মাণের জন্য রাজকর্মচারীরা এসে নির্বাচন করে গেছেন বনের শ্রেষ্ঠ, ঋজু ও দীর্ঘতম বৃক্ষটিকে। পরদিন ভোরেই রাজার সেপাইরা এসে কেটে নিয়ে যাবে তার শ্রেষ্ঠ সন্তানটিকে। শোকাভিভূত বনদেবী তাই তার দীঘল কালো এলোচুল ছড়িয়ে দিয়ে রাতের নির্জন প্রহরে বিলাপ করছেন। দীর্ঘ সুঠাম দেহের প্রিয় এই সন্তানটিকে বুকে একান্তে জড়িয়ে ধরে ক্রন্দসী বনমাতা ব্যথাদীর্ণ হৃদয়ে বলছেন ‘হে আমার স্বাস্খ্যবান প্রিয় যুবক পুত্র, তুমি যখন শিশুবৃক্ষ ছিলে তখন তোমাকে কি আমি বলিনি কখনো সবাইকে ছাড়িয়ে বেশি বেড়ে ওঠো না; আর দশজনের মতো এক সাধারণ বৃক্ষ সন্তানই হয়ে থেকো।… কাল ভোরে, রাজার সেপাইরা এসে তোমাকে হত্যা করবে, তখন কে আমাকে আর মা বলে ডাকবে প্রিয় সম্ভাষণে?… কে এসে পাশে দাঁড়াবে আমার দু:খের দিনে?’ হৃদয়স্পর্শী এ উচ্চারণ সন্তানহারা এক জননীর মর্মভেদী এ ক্রন্দনধ্বনী। প্রাণহীন বৃক্ষের শরীরের প্রাণারোপ করে সন্তানের প্রতি মায়ের অকৃত্রিম ভালোবাসারই এক অপূর্ব প্রকাশ ঘটেছে এই কাহিনী-কাব্যে। মধ্যযুগের মনিপুরী সাহিত্যে ‘রোমান্টিসিজম’ ও ‘পারসোনিফিকেশন’-এর এই অপরূপ প্রয়োগ নি:সন্দেহে এক বিরল ব্যতিক্রম।তবে অষ্টাদশ বা উনবিংশ শতাব্দীতে এসে মনিপুরী সাহিত্যে উর্মিমুখর স্রোতধারায় এক স্খবিরতা আসে। বাংলাদেশ থেকে আসা বৈষäব ধর্ম মনিপুরের প্রধানতম ধর্মের রূপপরিগ্রহ করার পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত বিপ্রতীপ সংস্কৃতির সঙ্ঘাত এবং বাংলা লিপি কর্তৃক মনিপুরী লিপির স্খান গ্রহণের কারণে সৃষ্ট ভাষাগত জটিলতা মনিপুরী জীবনে বিস্তার করে এক করাল ছায়া। ফলে এই কালপর্যায়ে মনিপুরী সাহিত্যের রত্নকোষে নতুন করে যুক্ত হয়নি তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য সৃষ্টির সম্ভার। এই ঊষার সময়ে সৃষ্ট সাহিত্য কর্মগুলো হলো তখেলঙম্বা, আওয়াঙম্বা, খাহিঙম্বা, সানামানিক প্রভৃতি।
আধুনিককাল
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ পাদে এসে মনিপুরী সাহিত্যের দিগিðলয়ে সূত্রপাত ঘটে আধুনিকতার যার পরিপুষ্টি বিংশ শতাব্দীর প্রথম পাদে বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে এসে। বাংলা সাহিত্যের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভ করা নবতর চেতনাবোধ এবং বাংলা সাহিত্যের উন্মুক্ত দরজা দিয়ে প্রবেশ করা পাশ্চাত্য সাহিত্যের প্রগল্ভ বাতাস মনিপুরী সাহিত্যের আঙ্গিক বৈশিষ্ট্য ও আস্তর চেতনায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত করে। তার ওপর বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে সংঘটিত দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধের তপ্ত হলকায় যেমন নবজাগৃতি ঘটে মনিপুরী মন ও মানসের; তেমনি সহসাই কেটে যায় মনিপুরী সাহিত্যের ওপর চেপে বসা স্খবিরতার কুয়াশাচাদরও। আধুনিকতার এই উন্মেষকালের প্রধান কবি-সাহিত্যিকরা হলেন লমাবম কমল, খাইরকপম চাউবা, হিজম অঙাংহল, হওয়াইবম নবদ্বীপচন্দ্র, অরাম্বম দরেন্দ্রজিৎ, অশাংবম মীনকেতন, রাজকুমার শীতলজিৎ প্রমুখ। এ সময়কালের আলোচিত গ্রন্থগুলো হচ্ছে লমাবম কমলের উপন্যাস- মাধবী, খাইরাকপম চাউবা’র কাব্যগ্রন্থ থায়নগী লৈরাং, ঐতিহাসিক উপন্যাস- লবঙ্গলতা, রাজকুমার শীতলজিৎ-এর ছোটগল্প সংকলন- লৈকোনুংদা এবং হিজম অঙাংহল এর খণ্ডকাব্য- শীংঙের ইন্দু, নাটক- ইবেম্মা প্রভৃতি। এ ছাড়া উনচল্লিশ হাজার পদ সম্বলিত খাম্বা-থোইবীর চিরন্তন প্রেমের মহাকাব্য হিজম অঙাংহল-এর ‘খাম্বা-খোইবী শৈরেং’ মনিপুরী সাহিত্যের এক গর্বিত ঐতিহ্য। তাদের সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে এগিয়ে আসেন সমরেন্দ্র, নীলকান্ত, এম কে বিনোদিনী, জি সি তোংব্রা, এলাংবম রজনীকান্ত, হিজম গুনো, খুমন্থেম প্রকাশ, শ্রী বীরেন, কুঞ্জমোহন, খৈরুদ্দীন প্রমুখ। এসব প্রতিভাবান কবি সাহিত্যিকের উজ্জ্বল মেধা ও মননের আলোক সম্পাতে মনিপুরী সাহিত্যের প্রাণময় প্রাঙ্গণ ভরে ওঠে বহুবর্ণা পুষ্পের সম্ভারে। ১৯৭২ সালে মনিপুরী ভাষা ভারতের সাহিত্য একাডেমীর স্বীকৃতি লাভ করে। তারপর থেকেই শুরু হয় মনিপুরী কবি সাহিত্যকদের একাডেমি এওয়ার্ড দিয়ে সম্মানিত করার পালা। এ ছাড়াও সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ভারত সরকার প্রদত্ত সবচেয়ে মর্যাদাবান উপাধি ‘পদ্মশ্রী’তে ভূষিত হয়েছেন মনিপুরী সাহিত্যের অনেক কবি ও সাহিত্যিক।
স্বকীয় সাহিত্যেই শুধু নয়, অনুবাদের ক্ষেত্রেও মনিপুরী সাহিত্য যথেষ্ট সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। মনিপুরী ভাষায় অনূদিত হয়েছে রামায়ণ, মহাভারতের মতো কালজয়ী সাহিত্যকর্ম; মেঘদূত, ইলিয়াড, ওডেসির মতো ক্লাসিক সাহিত্য; শ্রীমদ্ভগবতগীতা, বাইবেলসহ বিভিন্ন ধর্মের বিখ্যাত গ্রন্থাবলি; রবীন্দ্রনাথ, শেক্সপিয়ার, টলস্টয়, হোমার, বার্নাড শ’, সোফোক্লিস, বঙ্কিম, শরৎসহ বিশ্ব-সাহিত্যের মহৎ রূপকারদের অনন্য সব সাহিত্যকর্ম। শরৎচন্দ্রের তো সমগ্র রচনাবলিই অনূদিত হয়েছে মনিপুরী ভাষায়। মনিপুরী সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য অনেক সৃষ্টিকর্মও আজ অনূদিত হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায়।
বাংলাদেশে মনিপুরী সাহিত্যচর্চা
বাংলাদেশে মনিপুরী বসতি স্খাপনের ব্যাপ্তিকাল প্রায় তিনশ’ বছরের হলেও বাংলাদেশে মনিপুরী সাহিত্যচর্চার আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত ১৯৭৫ সালে ‘বাংলাদেশ মনিপুরী সাহিত্য সংসদ’ গঠন এবং সংসদের মুখপত্র ‘দীপান্বিতা’ প্রকাশের মাধ্যমে। অবশ্য তারও আগে থেকেই কেউ কেউ একক প্রয়াসে এবং বিচ্ছিন্নভাবে সাহিত্যচর্চার প্রয়াস পেয়েছেন। এ পর্যায়ে প্রোফেসার থোকচোম সোনামনি সিংহ, থোংখাতাবম নবকিশোর শর্মা, থোকচোম মনিহার সিংহ প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। দীপান্বিতা পরে ‘মৈরা’ নাম গ্রহণ করে এখনো তার প্রকাশনার ধারাবাহিকতা অক্ষুণí রেখেছে। এ যাবৎ প্রকাশিত মনিপুরী সাহিত্য সংকলনগুলোর মধ্যে মিৎকপথোকপা (এখন ‘ইথিল’ নামে প্রকাশিত হচ্ছে), শজিবু, ইপোম-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ্য। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ মনিপুরী সাহিত্য সংসদ প্রকাশ করে বাংলাদেশের প্রথম মনিপুরী কাব্যগ্রন্থ-এ কে শেরামের ‘বসন্ত কুন্নিপালগী লৈরাং’। পরে প্রকাশিত হয় শেরাম নিরঞ্জনের কাব্যগ্রন্থ- ‘মঙ মপৈ মরক্তা’, ‘অতোপ্পগী পিরাং’, ‘নাতৈ চাদ্রবা পৃথিবী’- প্রবìধগ্রন্থ- ফরংজাই ওয়াখল, হামোম প্রমোদের কাব্যগ্রন্থ-‘ওয়াখলগী নাচোম’, ‘মনিপুরী দর্পণ’ (সম্পাদিত), সনাতন হামোমের কাব্যগ্রন্থ- ‘লৈনম য়াওদ্রিবী লৈরাং’, ‘থওয়ায়গী নুংশিরৈ’, ও ‘মঙ মরক্তা’, ‘মুতুম অপু’র ‘এক বসন্তের ভালবাসা’ (সম্পাদিত) ও কাব্যগ্রন্থ ‘লৈরাংগী লৈরোং’, এ কে শেরামের ছোটগল্প গ্রন্থ ‘ নোঙ্গৌবী’ ও ‘বাংলাদেশের মনিপুরী কবিতা’ (সম্পাদিত), খোইরোম ইন্দ্রজিতের প্রবìধ সঙ্কলন ‘মচু নাইরবা মঙ’ ও কাব্যগ্রন্থ ‘ইন্নাফি’। এরা ছাড়াও বাংলাদেশের মনিপুরী সাহিত্যকর্মীদের মধ্যে যারা নিরলস চর্চার মাধ্যমে ইতোমধ্যে একটা নিজস্ব চারিত্র্য অর্জনে সমর্থ হয়েছেন, তারা হলেন শান্ত খুমন, খোইরোম কামিনীকুমার, কারাম নীলবাবু, শেরাম শরৎ, এল পদ্মমনি, এন শ্যামল, এন যোগেশ্বর অপু, নামব্রম শংকর, কন্থৌজম সুরঞ্জিত, থোঙাম সঞ্জয় প্রমুখ।
মনিপুরী সাহিত্যের মূল স্রোতধারা থেকে বিচ্ছিন্ন বিধায় বাংলাদেশে মনিপুরী সাহিত্য চর্চার ধারা খুব একটা বেগবান হতে পারছে না এটা সত্য। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের বিপুলায়তন ভাণ্ডারের প্রত্যক্ষ প্রভাবে পুষ্ট হওয়ার কারণে বাংলাদেশের মনিপুরী কবিতাগুলো বিষয় ব্যাপ্তিতে এবং গভীরতায়, শৈলী ও চেতনায় প্রায়ই নানা মাত্রাকে ছুঁয়ে যায় বলে এগুলো মনিপুরী সাহিত্যের মূলভূমি মনিপুরেও যথেষ্ট সমাদৃত। আমরা আশাবাদী, বাংলাদেশে মনিপুরী সাহিত্যচর্চার ধারা ক্রমশ বেগবান হবে এবং একদিন আপন বৈশিষ্ট্য নিয়েই মনিপুরী সাহিত্যের বর্ণময় সংযোজন বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকেও দেবে এক বর্ণিল বৈভব।
উপসংহার
মনিপুরী ভাষা ও সাহিত্য আজ আর মোটেও উপেক্ষণীয় নয়; বরং তার রয়েছে এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের বর্ণাঢ্য ভাণ্ডার। তবু দ্বিধা নেই এই অকপট স্বীকারোক্তিতে যে, আমাদের সাহিত্যকে আজো আমরা প্রার্থিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারিনি দিতে পারিনি এখনো কাáিক্ষত রূপৈশ্বর্য। অìধকার খনির গহ্বরে যেমন থাকে মহামূল্যবান স্বর্ণ-রত্নরাজি, অপাঙক্তেয় ঝিনুকের বুকের গভীরে লুকানো থাকে অমূল্য মুক্তো; তেমনি সংখ্যাস্বল্প এবং প্রগতির প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া মনিপুরী জাতির অবহেলিত সাহিত্যের সংকীর্ণ চৌহদ্দিতেও আছে এক সমৃদ্ধ ঐশ্বর্যের সযত্ন সঞ্চয় আছে দীর্ঘ ও গৌরবময় এক ইতিহাসের ধারা। কিন্তু খনির অìধকার গর্ভকোষ থেকে তুলে আনা স্বর্ণ-রত্ন-হীরা বা ঝিনুকের বুক থেকে আহরিত মুক্তোদানা যেমন কোনো শিল্পিত হাতের স্পর্শেই কেবল মূল্যবান হয়ে ওঠে বা চোখ ঝলসানো ঔজ্জ্বল্য পায়, তেমনি কোনো যোগ্যতম কবি বা সাহিত্যিকের বিরল প্রতিভার জাদুময় স্পর্শেই কেবল একটি সম্ভাবনাময় সাহিত্য জেগে ওঠে ভেসে ওঠে শিখরস্পর্শী উচ্চতায়। আমাদের দুর্ভাগ্য, মনিপুরী ভাষার প্রাণের দিগন্তে এখনো সেরকম কোনো শিল্পী-কোন কবির অভ্যুদ্বয় ঘটেনি। আমাদের সযত্ন লালিত এ ঐশ্বর্যকে বিশ্ববলয়ে যথার্থ উপস্খাপনে সক্ষম আমাদের হাজার বছরের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে উজ্জ্বল মেধা ও মননের শাণিত আলোকে ভালোবাসার প্রাণময় স্পর্শে উজ্জ্বলতর করে তুলতে পারে এমন একজন কবির জন্যই আমাদের আজকের প্রগাঢ় প্রতীক্ষা।

খবরটি পড়েছেন :411
  • Print
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Google Bookmarks
  • email
  • LinkedIn
  • Twitter
  • Add to favorites
  • StumbleUpon
  • PDF

এমন আরো কিছু পোষ্ট:

  1. গুগলে বাংলা সাহিত্য
  2. হাতিদের গোপন ভাষা
  3. রবীন্দ্রালোকের প্রাত্যহিকতায়
  4. হাতির গোপন ভাষা
  5. গুগল অভিধানে আছেবাংলা ভাষা
  6. হোটেল কৰে গোপন ক্যামেরা রেখে
  7. বাংলা ভাষার জন্য পরীক্ষামূলক ডোমেইন
  8. গোপন কথাটি রবে না গোপনে!
  9. সুঠাম স্বাস্থ্যের গোপন রহস্য
  10. বার বার তার কাছে ফিরে আসি – জু বা ই দা গু ল শা ন আ রা

You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0 feed. You can leave a response, or trackback from your own site.

Leave a Reply

XHTML: You can use these tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>