নিজেকে নিয়ে, সময়কে নিয়ে

হায়াত্‍ মামুদ
ইন্দির ঠাকরুন মরে যাবার সঙ্গে সঙ্গে একটা যুগ শেষ হয়ে গিয়েছিল। কালচিহ্ন কিছু কিছু রয়ে যায়, সমাজের শরীরে সাপের মতো খোলস ছাড়তে-ছাড়তে সময় থেকে সময়ান্তরে যেতে থাকে। কালচিহ্ন, ইন্দির ঠাকরুনের মতো, এক সময় মরে যাবে। নতুন যুগের কালচিহ্ন আবার তৈরি হয়।

এসব কথা ক্রমান্বয়ে ঢেউয়ের মতন ভেতরে এসে আছড়ে পড়ছে, যখন আমি ঊনসত্তুর অতিক্রান্ত একজন মানুষ, অনুজ বন্ধুদের নেই আঁকড়েপনা ঠেলতে না পেরে নিজেকে নিয়ে এবং নিজের সময়কে নিয়ে দু চার কথা বলতে বসেছি। সময়টা কত আলাদা হয়ে গেছে এখন। এ ঢাকা শহরেরই মুখ আর ধড়ের ছাঁচ চোখের সামনেই তো পালটে গেল, এখনও পাল্টাচ্ছে। পুরো প্রায়-ষাট বছর এ শহরে আছি। কত ভাঙচুর, কত নতুন বেড়ে-ওঠা, গড়ে-ওঠা দেখতে-দেখতে আমরা, আমার বয়েসী লোকজন বেড়ে উঠেছি। এই স্মৃতিচারণা লিখতে হচ্ছে কি তবে এজন্য যে আমি ইন্দির ঠাকরুনের অবস্থায় ও অবস্থানে এরই মধ্যে এসে পড়েছি।

গ্রামের কথা কিছু মনে পড়ে বৈকি। সেই কোন জন্মে ফেলে আসা গ্রাম! আমি যদিও পশ্চিম বাংলার ছেলে, সেখানকারই এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গ্রামে বছর দশ-এগারো পর্যন্ত থেকেছি, সেই গ্রাম পূর্ববাংলার ঐ রকম কোনও এঁদো গাঁ থেকে ভিন্ন কিছু ছিল না- অন্তত বুনোটে। নিসর্গ চিত্র নিশ্চয় ভিন্ন ছিল।

জলা-নদী-খাল-বিল এখানে বেশি। হুগলী-বর্ধমানের মাটি এখানকার মতো সরস নয়। কিন্তু গ্রামীণ গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনের চেহারা সারা বঙ্গভূমি জুড়েই একই ছিল, অন্তত অর্ধ শতাব্দী পূর্বে। আমি একবার একটি ফুল দেখেছিলাম ময়মনসিংহ শহরের আলেকজান্ডার গার্ডেনে। পারিজাত। সেই প্রথম দেখি। ওয়াহিদ ভাই, সঙ্গীতজ্ঞ-সাংবাদিক প্রাবন্ধিক ওয়াহিদুল হক চিনিয়ে দিয়েছিলেন, ভারি লাল টুকটুক চেহারা ঐ ফুলের। ফুল নাকি কুসুমগুচ্ছ! একটা বোঁটাতে একটা ফুল নয়, একটি বৃন্তকে কেন্দ্র করে গাঁথা হয়েছে অনেক ক’টি স্বয়ংসম্পূর্ণ বিকশিত ফুলের বৃত্ত। আমার চেতনায় গ্রামের গড়নগুলো ছিল এরকম। কৃষি নির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থায় সবখানেই মনে হয় এ রকমটাই ঘটে। একান্নবর্তী পরিবার ছাড়া পরিবারের আর যে কোনও ভিন্ন ছক ছিল না এটাই তার কারণ। কৃষিকর্মে তো অনেক হাতকে একসঙ্গে মিলতে হয়। পিতামহ থেকে পৌত্র পর্যন্ত তিন প্রুজন্মের ছড়ানো বিভাজিত কর্মবিন্যাস। ফসল যা উঠলো তা যৌথ পরিবারিক সম্পত্তি। আবার আমরা পরিবারের সঙ্গে তোমার পরিবারটারও একটি অদৃশ্য গাঁটছড়া দেয়া আছে-শূধু সহাবস্থানের মায়া নয়, স্বার্থের বাঁধন, বাঁচা-মরার লড়াইয়ে সহযোদ্ধার বাঁধন। পরিবারের ছেলে-মেয়েগুলো কেবল পরিবারেরই নয়, সারা গ্রামের, গ্রামবাসী সকলের। এ ছবিটিই গ্রামবাংলার ছবি। এখন ক্রমাগত ভাঙতে ভাঙতে এ ছবিটি এত ছত্রাখান হয়ে গেছে যে কল্পনাতে জোড়া লাগালেও সেই আদলটি চিনিয়ে দেয়া যাবে না। আমার বয়সী সকলেই, যাঁরা আমাপেক্ষা আরও প্রাচীন তাঁরা তো বটেই, এ আবেষ্টনীতে বেড়ে উঠেছি। না, গ্রাম মানে মর্ত্যভূমিতে এক টুকরো স্বর্গখণ্ড এমন কথা বলতে চাইছি না। শরৎচন্দ্রের ‘পল্লীসমাজ’ গ্রামীণ বাঙালির জীবনচর্চাকে হুবহু ধরে রেখেছে। সেখানে কত মন্দবুদ্ধি-ঈর্ষা-শাঠ্য-দুরভিসন্ধি-পরশ্রীকাতরতা। এখনও সবই আছে। ফলে গ্রামকে স্বর্গের সঙ্গে কেউ তুলনা করবে না, অন্তত গ্রামের মহাজন তো নয়ই। কিন্তু একটা বাঁধন ছিল: মানবসম্পর্কের বেশ বড়সড় একটা রঙিন বুনোটে তৈরি নকশি-কাঁথা। সবই গায়ে গায়ে লেপ্টানো, জড়ানো। কোনও বিচ্ছিন্ন ব্যাপার ছিল না। সম্পর্কের এ জটিল, নিবিড়, একই সঙ্গে গলাগলি ও সংঘাতপ্রবণ, হাসি, কান্নার দোল-দোলানো সে এক অদ্ভূত ব্যাকরণহীন মায়াবী জগৎ। আমি এ জগতের ভেতরেই ছিলাম একসময়ে এখন বাঁধন কেটে না হয় বেরিয়ে এসেছি, গায়ে কিন্তু গাঁয়ের গন্ধ এখনও লেগে আছে বলে আমার ধারণা।

আমার শহুরে জীবন গ্রামীণ জীবনের চেয়ে চারগুণ বেশি। তবু আমি ‘শহুরে’ কিনা তা নিয়ে মনে সংশয় আছে। আমাকে কেউ ‘গেঁয়ো’ বলে কিনা জানি না, বললে আমি খুশি হব না। তবে ‘শহুরে’ বললেও উৎফুল্ল হওয়ার কারণ দেখি না। আমার বাড়ির চালচলন শহুরে ধনীর নয়, সেটা আমার পিতৃআমল থেকে, গ্রামীণ সম্পন্ন গৃহস্থের ছাদে পাকাপোক্তভাবে গেঁথে বসা। আমাদের পরিবার, এই ঢাকা শহরে এবং ২০০৮ সালেও যে একান্নবর্তী তা অনেককেই বিস্ময়বিমূঢ় করে, আমি দেখেছি। কেন অবাক করে, বুঝি। এখনকার সমাজের গড়ন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, দ্রুতগতি প্রাত্যহিক জীবন ইত্যাদির মিশ্রণে শহুরে জীবনের যে ঘ্যাঁটনিত্য রান্না হচ্ছে তাতে সঙ্ঘজীবনের অস্তিত্ব থাকার কথা নয়। আমাদেরটা আছে, তো সে কি আলাদীনের চেরাগ? এখানটিতে আমি, আমাদের পরিবার, আমরা কেউ ‘আধুনিক’ নই। কে জানে হয়ত বা সত্যিই গ্রাম্য, ফিউডাল, পিছিয়ে-পড়া, অনাধুনিক। এগুলো সবই গালাগাল-আমি জানি। কিন্তু আপনাদের গালাগালির ভয়ে আমরা কি আমাদের শান্তি নষ্ট করবো?

গাঁয়ের লোক ভারি বোকা, কিন্তু চাষাড়ে বুদ্ধিতেই সে চিরকাল আত্মরক্ষা করে আসছে। ঠিক না?

লেখক: প্রাবন্ধিক

খবরটি পড়েছেন :562
  • Print
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Google Bookmarks
  • email
  • LinkedIn
  • Twitter
  • Add to favorites
  • StumbleUpon
  • PDF

এমন আরো কিছু পোষ্ট:

  1. নিজেকে চেনে ম্যাগপাই
  2. কর দেয়া মানে দেশের উন্নয়নে নিজেকে সম্পৃক্ত করা
  3. হাড়ি নিয়ে শ্বশুরবাড়ি
  4. স্ত্রীকে নিয়ে স্বামী-প্রেমিকের লড়াই, অবশেষে থানাহাজতে
  5. দর্শনাখ্যান : ভাষা নিয়ে কথা থাকে
  6. ১৯৭৪ সালে জন্ম নিয়ে ভাতা নিয়েছেন মুক্তিযোদব্দার!
  7. ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর ভেলকিবাজি
  8. পিতার কুকীর্তি নিয়ে ছেলের তথ্যচিত্র
  9. যেভাবে বেড়ে উঠি : ধর্ম নিয়ে রাজনীতি সবচেয়ে বড় দুর্নীতি
  10. ‘পথের পাঁচালী’কে নিয়ে ‘অপুর পাঁচালী’

You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0 feed. You can leave a response, or trackback from your own site.

Leave a Reply

XHTML: You can use these tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>