তসলিমা নাসরিন: তোমার কাছে আমার অশেষ ঋণ………

সজীব সরকার: ‘তসলিমা নাসরিনের লেখা’ ৭ আগস্ট ২০০৮ আমাদের সময়ে পড়লাম। বেশ ভালো লাগল যে তাঁর অকাট্য যুক্তি-বাণ ঠিক আগের মতোই আছে। কিন্তু পুরুষের চরিত্রটিও যে আগের মতোই আছে, তার কি কিছু করার আছে? আমি যতখানি বুঝি, তাতে মনে হয়, পুরুষের কুকীর্তিগুলো তাৎক্ষণিকভাবে তাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে চূড়ান্ত লজ্জা দেয়া ছাড়া আর কিছু সম্ভবত এদের বিরুদ্ধে করার নেই। কেননা, জাতি-শ্রেণী, ধর্ম-বর্ণ ও স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে পুরুষ একই এবং অভিন্ন চরিত্রের অধিকারী, একজন পুরুষ সবসময়ই পুরুষ, তা সে বাবা-ছেলে-ভাই-মামা-চাচা কিংবা অন্য কিছু যা-ই হোক না কেন।

পুরুষের ‘সার্বজনীন’ চরিত্রহীনতা, কপটতা দেখে দেখে সেই ছোটবেলা থেকেই, আমি নিজে পুরুষ-প্রজাতিভুক্ত হয়েও নিজের কাছেই নিজে মাথা তুলতে পারি না। পুরুষ হওয়ায় ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভুগি সবসময়। সবসময় সতর্ক থাকার চেষ্টা করিÑ আরেকটি তসলিমা নাসরিন তৈরিতে আমিও যেন একটি অংশ হয়ে না পড়ি। তসলিমা নাসরিনের জীবনে যে পুরুষরা এসেছে, আমি যেন কখনোই সেই গোত্রভুক্ত হয়ে না পড়ি। তসলিমা নাসরিনের কবিতাগুলোতে আমি যে তসলিমা নাসরিনের সন্ধান পেয়েছি, তা থেকেই আমি নারীকে তার স্বরূপ থেকে, মূল থেকে বুঝতে শিখেছিÑ জীবনে প্রথমবারের মতো। তসলিমা নাসরিনের কবিতায় আমি যে নারী তসলিমা নাসরিনকে জেনেছি, সেই নারীর কাছেই আমার সত্য, পবিত্র ভালবাসার প্রথম পাঠ। তাকে জেনেই আমি জেনেছি, একজন নারীকে সত্যি করে ভালবাসতে পারাটা হচ্ছে পৃথিবীর পবিত্রতম ধর্ম, সুন্দরতম উপাসনা। কিন্তু, একজন নারীকে সত্যি করে ভালবাসতে পারার সৌভাগ্য সবার হয় নাÑ এর জন্য সবার প্রথমে একটি পুরুষকে একজন নারীর উপযুক্ত হয়ে উঠতে হয়, যার জন্য প্রয়োজন ধীরতা আর অশেষ সংযম।

তসলিমা নাসরিনের জীবনের তিক্ত সত্যগুলো জানার আরো কিছুকাল পরে আমার তাঁর কবিতাগুলো পড়ার সৌভাগ্য হয়। অস্বীকার করবো না, কবিতাগুলো পড়ার আগ পর্যন্ত নারীর প্রতি আমার কেবল দরদ ছিল, মায়া ছিলÑ শ্রদ্ধা বলতে তখনও কিছু আমি শিখিনি। নারীর প্রতি সম্ভমে আনত হতে আমি শিখেছি তাঁর সেই অদ্ভুত সহজ-সরল, সত্য (কিন্তু ‘তিক্ত’) কবিতাগুলো পড়ে, আজ আমি নির্লজ্জের মতো আমার নারীকে বলতে পারিÑ ‘আমি তোমাকে ভালবাসি’। আমার বুক কাঁপে না, এটি আমার গর্ব। আমি আমার নারীকে শুধু ভালবাসতে শিখিনি। শিখেছিÑ তাকে শুধু ভালবাসাটাই যথেষ্ট নয়, তাকে সম্মান করতেও শিখতে হবে। আমি জেনেছি, আমার থেকে আমার নারীর স্থান অনেক উঁচুতেÑ সে নারী বলে, আর আমি নারী নই বলে।

আমি কৃতজ্ঞ তসলিমা নাসরিনের কাছে; আমার নারীকে আমি সত্যি করে, অকপট ভালবাসতে পেরেছি, সম্মান করতে শিখেছি নারীর ভালবাসার মহোত্তম রূপটিকে জানবার দুর্লভ সৌভাগ্যটি আমার হয়েছে বলেই। আর আমার এই অর্জন পুরোটাই তসলিমা নাসরিনের (জীবনী নয়) জীবন থেকে, মূলত তাঁর কবিতা থেকে। তসলিমা নাসরিনের ভালবাসাকে যে-ই অসম্মান করেছে, সে শুধু নির্বোধই নয়, পাপীও। এমন নির্বুদ্ধিতা, এমন পাপ যেন আমার দ্বারা কখনো না হয়Ñ সেই সচেতনতাটুকু আমি পেয়েছি তাঁর জীবন থেকেই।

ময়মনসিংহে তসলিমা নাসরিনের পৈত্রিক বাসস্থান থেকে আমার বাসস্থান দু-তিনটি বাড়ি দূরেই। তবুও এই মহীয়সীর দেখা পাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। আমি তাঁকে জানার আগেই তাঁকে তাঁর নিজের শহর ছেড়ে, নিজের দেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। জীবনে কোনোদিন হয়তো তাঁর সঙ্গে দেখা হবে না, কথা বলার সুযোগ হবে না। কিন্তু তাঁর কাছে আমার এই ঋণের কোনো কমতি কখনো হবে না যে, তার লেখা পড়েছি বলেই আমি পুরুষ হয়েও শুধু একজন মানুষমাত্র হয়ে থাকার জন্য মরিয়া হয়ে উঠতে পেরেছি। তার লেখা পড়েছি বলেই আমি জীবনের একটি সুন্দর উদ্দেশ্য পেয়েছি। তার লেখা পড়েছি বলেই আমি পুরুষ হয়েও আমার নারীর কাছ থেকে তা পেতে শিখেছি, যা অন্য দশটা পুরুষ তাদের নারীদের কাছ থেকে পাওয়ার কথা সারা জীবনে জানতে পর্যন্ত পায় না!

আমার অনেক দিনের ইচ্ছাÑ তসলিমা নাসরিনের সামনে দাঁড়িয়ে আমি তাঁর কাছ থেকে আশীর্বাদ নেব, ‘যে ভালবাসা আমি বাসতে শিখেছি তোমার ভালবাসতে পারার তীব্র ক্ষমতা দেখে, তোমার যে অতল তল ভালবাসা আমি দেখেছি (তোমার কবিতায়), আমার ভালবাসাকে আমি যেন তার সš§ান করতে পারি’। জানি, আমার এই ইচ্ছা পূরণ হবে না কখনো; তবু মনে মনেই তাঁর আশিস নিয়ে যাব বাকি জীবনও, এখন যেমন নিয়ে যাচ্ছি। আর সবসময়ই আমি এই কামনাই করিÑ মানুষকে পশু করে দেয়, মানুষকে মানুষের থেকে আলাদা করে দেয় যে ‘ধর্ম’ আর যে পুরুষ (তন্ত্র), সেই অন্ধকারের বিরুদ্ধে তসলিমা নাসরিনের আজীবন সংগ্রাম যেন সফল হয়, আর সেই সুন্দর পৃৃথিবীটি যেন তিনি তাঁর জীবদ্দশাতেই দেখে যেতে পারেন। আর সেই সৌভাগ্যটি আমারও যেন হয়।

ই-মেইল: sajeeb.an@yahoo.com


খবরটি পড়েছেন :1988
  • Print
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Google Bookmarks
  • email
  • LinkedIn
  • Twitter
  • Add to favorites
  • StumbleUpon
  • PDF

এমন আরো কিছু পোষ্ট:

  1. নির্বাসন হলো ধীরগতির মৃত্যু: তসলিমা নাসরিন
  2. বাংলাদেশে নারী বা পুরুষ যে-ই ক্ষমতায় আসুন-না কেন, সবাই দুর্নীতিবাজ, হিপোক্র্যাট- তসলিমা নাসরিন
  3. দাউদ হায়দার ও তসলিমা নাসরিন দেশে ফিরতে চাইলে সরকার বাধা দেবে না
  4. আমার নাগরিকত্ব যদি বাতিল করা না হয় তাহলে পাসপোর্ট নবায়নে বাধা কোথায়
  5. তসলিমা নাসরিনের লেখা
  6. নারীকে ছেড়ে যায় সুখ, ধরা পড়ে পুরুষের কাছে
  7. আমার শিক্ষক, কবি, গীতিকার মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান
  8. তসলিমার সম্পর্কে মুসলমানদের অনুভূতিকে সম্মান দিচ্ছেন মমতা
  9. পুরুষের পছন্দের নারীদেহ কেমন?
  10. আমার প্রিয় নোমান স্যার মমতাজউদ্দীন আহমদ

You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0 feed. You can leave a response, or trackback from your own site.

Leave a Reply

XHTML: You can use these tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>