এই তাহলে ওয়ান ইলেভেনের উদ্দেশ্য?
সৈয়দ বোরহান কবীর
ওয়ান-ইলেভেনের চেতনা নিয়ে এযাবৎ সময় অনেক লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু গত কয়েকদিনের ঘটনাবলিতে ওয়ান-ইলেভেনের মূল চেতনা জাতির সামনে উন্মোচিত হয়েছে। গত কয়েকদিনের ঘটনায় আমার কাছে মনে হয়েছে ওয়ান-ইলেভেনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিএনপি-জামায়াত জোটকে সাফ-সুতরো করে জনরোষ থেকে বাঁচিয়ে জাতির সামনে উপস্খাপন করা। তাদের অতীতের দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন ঢেকে দেয়া।
বিচারপতি কেএম হাসানের সঙ্গে ক’মাস আগে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে আমার দেখা হয়েছিল। ব্যক্তিগতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি আমার শিক্ষক ছিলেন, সেই সূত্রে তাকে জিজ্ঞেস করলাম আপনি প্রথমেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণে অপরাগতা প্রকাশ করলেন না কেন? তিনি আমাকে বললেন, আওয়ামী লীগ তো প্রথমে রাজি ছিল। আমার সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাদের কথা হয়েছিল। তারা বলেছিল, আমাকে মেনে নেবে। দু:খ করে তিনি বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ এরকম এডামেন্ট হয়ে যাবে আমি ভাবতে পারিনি।’ আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আলাপচারিতায় বলেছেন, আওয়ামী লীগ প্রথমে কে এম হাসানের ব্যাপারে পজিটিভ ছিল। কিন্তু তারপর কোথায় থেকে যেন কী হয়ে গেল। একথা আজ সবাই স্বীকার করবেন, বিচারপতি কেএম হাসানের অধীনে নির্বাচন করলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট বিপুল ভোটে বিজয়ী হতো।
নাজিম কামরান চৌধুরী, ২০০ সালের নির্বাচনের আগে ডেইলি স্টারে নির্বাচনি জরিপভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন। তাতে তিনি বলেছিলেন, নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। তার ঐ জরিপকে আওয়ামী লীগ পাত্তা দেয়নি। ২০০৬ সালে নাজিম কামরান চৌধুরীর আরেকটি নির্বাচনি জরিপ প্রকাশিত হয়; একই পত্রিকায়। তাতে তিনি দেখান, নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবি অনিবার্য। তিনি তার নির্বাচনি জরিপে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের দুই-তৃতীয়াংশ আসন প্রাপ্তির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। ২০০১-এ আওয়ামী লীগ পাত্তা না দিলেও বিএনপি ২০০৬ সালে এই গবেষণাকে উপেক্ষা করেনি। তারপর ঘটতে থাকে একেরপর এক ঘটনা।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বেও নির্বাচনে যেতে প্রস্তুত ছিল। এজন্য গড়ে তুলেছিল মহাজোট। তথ্য উপাত্ত ছাড়াই বলা যায়, মহাজোট নিয়ে ইয়াজউদ্দিনের অধীনে নির্বাচনে গেলেও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট বিপুল ভোটে জয়ী হতো। কিন্তু এরশাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্যতার ইসুতে আওয়ামী লীগ সেদিন কেন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালো? তা কোটি টাকার প্রশ্ন। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা বলেছেন, বিশেষ মহল থেকে তাদের নির্বাচনে না যাবার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এরশাদের ভূমিকাই প্রমাণ করে, যারা সেদিন আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে সরে দাঁড়াতে বলেছিল তারা আওয়ামী লীগের বন্ধু না, আসলে তারা আওয়ামী লীগকে বিভ্রান্ত করেছিল।
আওয়ামী লীগসহ মহাজোটের নির্বাচন বর্জনের প্রেক্ষাপটে ওয়ান-ইলেভেন তৈরি হয়। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে এক একে গ্রেফতার হতে থাকেন গিয়াসউদ্দিন আল মামুন, মোসাদ্দেক আলী ফালু, পিন্টু, তারেক রহমানসহ অনেকে। এই সময় লক্ষ্য করা গেল, বিএনপি এবং আওয়ামী লীগকে এক পাল্লায় মাপা শুরু হয়ে গেল। ভারসাম্য রক্ষার নামে বিএনপির একজনকে গ্রেফতার করলেই, আওয়ামী লীগের সমপর্যায়ের একজনকে গ্রেফতার করা শুরু হলো। বিএনপির ৫ বছরের দুর্নীতি, অপশাসন, সন্ত্রাস নৈরাজ্য আড়াল করে, প্রচারিত হতে থাকলো দুই দলের দুর্নীতি, দুই দলের ব্যর্থতা।
কেউ প্রশ্ন তুললো না, আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা কোথায়? আওয়ামী লীগ তো মেয়াদান্তে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ক্ষমতা তুলে দিয়েছিল? আওয়ামী লীগের আমলে কথিত দুর্নীতির বিচার তো ৫ বছরে বিএনপি আমলে হয়েছে। বিএনপির দুর্নীতির আড়াল করতে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্খানীয় নেতা কর্মীদের চরিত্র হনন শুরু হলো। তারেক রহমান এবং তার হাওয়া ভবনকে ঘিরে যে অঘোষিত সাম্রাজ্যের কথা আকাশ-বাতাসে ভাসতো তার কোনোকিছুই উìেôাচন না করে চাঁদাবাজির মতো হাস্যকর মামলায় জড়ানো হলো। অন্ধকারেই থেকে গেলো হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ খাতে অপচয়ের কাহিনী, উìেôাচিত হলো না, অটোরিকশা (সিএনজি) আমদানির রহস্যের মতো দুর্নীতির রহস্যগুলো।
এখন তারেক রহমান মুক্ত। একদিনে পাঁচটি মামলায় জামিন পান তারেক রহমান। ‘আপসহীন নেত্রী’ বেগম খালেদা জিয়া তিন ঘন্টা বৈঠক করেন খোন্দকার দেলোয়ার এবং ’৭১-এর ঘাতক আলী আহসান মুজাহিদের সঙ্গে। এখন দেশের মানুষ আর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সেই ভয়াবহ দিনগুলো স্মরণ করে না, কারণ এদেশের মানুষের স্মৃতির আয়ুষ্কাল খুবই কম। গত ২০ মাসে এই সরকারের দায়িত্বহীন নীতি এবং অযোগ্যতায়, জনগণ প্রথমত চায় এই সরকারের হাত থেকে মুক্তি। তাই তারেক এখন আর ঘৃণিত নাম নয়, জাতীয় বীর। ব্যাপারটা এরকম, চুরি করতে গিয়ে কেউ নর্দমায় পড়ে গেছে। জনরোষ থেকে বাঁচাতে তাকে পুলিশ ধরলো। ধরে গোসল করিয়ে নতুন জামা কাপড় পরিয়ে ছেড়ে দিলো আমি বিনীতভাবে জানতে চাই, তারেক রহমানের চেয়ে কি ওবায়দুল কাদের, মির্জা আজম বেশি দুর্নীতিবাজ? তারেক রহমানের চেয়েও কি আতিকুল্লাহ খান মাসুদ জাতির জন্য ভয়ঙ্কর?
বেগম জিয়ার অনুগতরা এখন গলা ফাটিয়ে বলবে, আপসহীন নেত্রী কোনো সমঝোতা না করেই মুক্তি পেলেন। তারেক রহমানের ইয়ার- দোস্তরা বলবেন, তারেক রহমান দুর্নীতিবাজ একথা কে বলে? আর আমাদের মতো সাধারণ জনগণ দেখবো ১/১১ কিভাবে জনতার রায়কে কুক্ষিগত করে। কিভাবে জনগণের বিজয়কে হাইজ্যাক করা হয়। কিভাবে একটি গণধিকৃত গোষ্ঠীকে পুনর্বাসিত করা হয়। এই সরকার যখন প্রথম ক্ষমতায় আসে তখন অনেকে আমাকে বলেছিল, এই সরকারে যারা আছেন তারা সবাই নানাভাবে বিএনপির সুবিধাভোগী, বিএনপিকে বাঁচাতেই এরা ক্ষমতা নিয়েছে। তখন আমি বুঝিনি, এখন বুঝি আমি কত বোকা।
পরিপ্রেক্ষিত – নির্বাহী পরিচালক।
খবরটি পড়েছেন :340এমন আরো কিছু পোষ্ট:
- ১৮ বছরের রেকর্ড ভঙ্গ করলেন ড. ফখরুদ্দীন
- মুন্সীগঞ্জে প্রাক-নির্বাচনি পরিবেশ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শুরু করেছে এনফ্রেল
- বি চৌধুরী নতুন জোটের প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যস্ত, টার্গেট মান্নান ভূঁইয়াও
- আর ভোটে দাঁড়াতে চান না খোকা তবে
- মুন্সীগঞ্জ-৪ আসনে মহাজোটের প্রার্থী নিয়ে সংশয় মনোনয়ন পেতে জাপা নেতার জোর তদবির
- আমার নাগরিকত্ব যদি বাতিল করা না হয় তাহলে পাসপোর্ট নবায়নে বাধা কোথায়
- পর্দার আড়ালে চলছে লবিইং
- জোট নেতার সঙ্গে করমর্দন যদি পাপ হয় জোট নেত্রীর সঙ্গে বৈঠক কি মহাপাপ হবে না?
- সৌদি রাষ্ট্রদূতের নৈশভোজে জামায়াত নেতাদের পাশে তোফায়েল আহমেদ
- গজারিয়ায় আ.লীগ নেতার গাড়ি ভাঙচুর
You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0 feed. You can leave a response, or trackback from your own site.
