হুমায়ূন আহমেদের সাক্ষাত্কার, হুমায়ুন আজাদের আমেরিকা প্রীতি ও ফরহাদ মজহারের দৃষ্টিতে লেখক স্বাধীনতা
হুমায়ূন আহমেদের সাক্ষাত্কার, হুমায়ুন আজাদের আমেরিকা প্রীতি ও ফরহাদ মজহারের দৃষ্টিতে লেখক স্বাধীনতা
দেবদুলাল মুন্না:
১৮ জুলাই ২০০৮ তারিখে সমকাল পত্রিকায় কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের একটি সাক্ষাত্কার প্রকাশিত হয়েছে৷ তিনি সাধারণত সাক্ষাত্কার দেন না৷ মিডিয়া থেকে দূরে থাকতে ভালবাসেন৷ এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে অনেকদিন পর অনেক বিষয়ে কথা বলেছেন৷ বাজারে দ্রব্যমূল্য বেশি নয়, মৌলবাদীদের সমস্যা নেই এমন অনেক কথা বলেছেন যেগুলো ইতোমধ্যেই আলোচনার খোরাক হয়েছে৷
হুমায়ূন আহমেদ বলেছেন, বাংলাদেশের লেখকরা স্বাধীন৷ তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তাহলে হুমায়ুন আজাদকে মরতে হলো কেন? তসলিমা নাসরিনকে দেশ থেকে বিতাড়িত হতে হলো কেন? জবাবে তিনি বলেছেন, ‘হুমায়ুন আজাদ যে বইটি লিখেছিলেন তা এত কুত্সিত, যে কেউ বইটা পড়লে আহত হবে৷ তার জন্য মৌলবাদী হতে হয় না৷’ তসলিমা নাসরিনের লেখাও তার বিবেচনায় এমনই৷ প্রশ্ন হলো, কোন লেখাটি ভালো আর কোনটি কুত্সিত_ এটি কোন মানদণ্ডে বিচার করবেন হুমায়ূন আহমেদ? বিশ্বসাহিত্যের অনেক লেখাকে একসময় অশীল-কুত্সিত বলা হয়েছিল৷ দেখা গেছে, কালের বিচারে সেগুলো সমাদৃত হয়েছে আবার যে লেখাগুলোকে মনে করা হত কালজয়ী হবে_ সেগুলো হারিয়ে গেছে৷ বড় কথা, কুত্সিত লেখা লিখলে হামলা চালালে বা নির্বাসনে পাঠালে দোষ নেই? হুমায়ূন আহমেদের বিবেচনায়, হুমায়ুন আজাদ ও তসলিমা নাসরিন কুত্সিত লেখা লিখেছেন বলেই এমন পরিণতি প্রাপ্য ছিল৷
তার এমন বক্তব্যে মৌলবাদীরা নিশ্চয়ই আস্কারা পাবে৷ সাক্ষাত্কারটিতে নাসরিনের প্রতি হুমায়ূনের একটু সহানুভূতি দেখা গেলেও হুমায়ুন আজাদ সম্পর্কে এক লাইনের বেশি বলেননি৷ অথচ উটকো মন্তব্য না করে একটু ডিটেইলস-এ গেলে অনেক প্রশ্নই ওঠার সুযোগ থাকত না৷ আমরা জানি একসময় হুমায়ূন আহমেদ ও হুমায়ুন আজাদের মধ্যে সুসম্পর্ক ছিল৷ আড্ডা দিতেন, মদ্যপান করতেন একত্রে৷ তাদের সমসাময়িক লেখকের লেখাতে এ বিষয়গুলো এসেছে৷ তাদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে তবে কখন? আমরা জানি, হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তা যে সময়ে বাড়ছিল সেসময় তার উপন্যাসকে ‘অপন্যাস’ বলে খারিজ করে দিতে চাইতেন হুমায়ুন আজাদ৷
সেসময়ে হুমায়ূন আহমেদের কাছে এ ব্যাপারে সাংবাদিকরা, লেখকরা তার প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছেন৷ তিনি নিশ্চুপ থেকেছেন৷ উল্টো হুমায়ুন আজাদের ‘আমার অবিশ্বাস’ বইটি প্রকাশের পর প্রশংসা পর্যন্তকরেছিলেন৷ সেই হুমায়ূন আহমেদই কিনা এতদিন পর হুমায়ুন আজাদের লেখাকে ‘কুত্সিত’ বললেন? কুত্সিত বলার অধিকার তার রয়েছে৷ কিন্তু কুত্সিত (?) লিখলে মেরে ফেললে কিছু যায়-আসে না? হুমায়ূন আহমেদের ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটক বিটিভিতে একসময় অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিল৷ নাটকের একটি প্রধান চরিত্রের নাম ছিল ‘বাকের’৷ চরিত্রটি ছিল মাস্তান টাইপের৷ নাটকের শেষ দিকে দেখা যায়, বাকের আদালতে দোষী সাব্যস্তহলে ফাঁসিতে মৃতু্যদণ্ড হয়৷ নাটকের শেষ পর্ব প্রচারিত হওয়ার আগে মিডিয়াতে বাকেরের পরিণতি সম্পর্কে আগাম তথ্য জানানো হলে দেখা যায় ‘বাকেরের ফাঁসি চাই না’ এমন সােগান দিয়ে দেশের নানান জায়গায় দর্শকরা মিছিল করে৷ তখন নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদ পত্রিকার সঙ্গে সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, ব্যক্তিগতভাবে যেকোনো অপরাধের শাস্তিহিসেবে মৃতু্যদণ্ডের বিপক্ষে তিনি৷ হুমায়ূন আহমেদের মনে আছে সেই কথা?
হুমায়ুন আজাদের মৃতু্য ও লেখকের স্বাধীনতা বিষয়ে প্রশ্নটি যখন তাকে করা হয়েছিল তখন এ কথাগুলো কী ভাবেননি যে তার এমন উত্তরে মৌলবাদীরা আস্কারা পাবে৷ ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে থাকা ক্ষমতাবানরা আস্কারা পাবেন লেখকের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করতে৷ কারণ হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখক বলেছেন ‘বাংলাদেশের লেখকরা স্বাধীন’ সেখানে তো আর বদনামের ভয় নেই৷ হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে তার লেখক সত্তার আদর্শিক দ্বন্দ্ব থাকতেই পারে_ তাই বলে এমন মনোভাব পোষণ করবেন যে, হুমায়ুন আজাদকে মারতে হলে মৌলবাদী হতে হয় না? সত্যি অবাক হতে হয়৷
অবাক হয়েছিলাম হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে কথা বলেও একদিন৷ তার সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক ছিল৷ দেশের অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি৷ মনে পড়ে, বইমেলায় আততায়ীর হাতে আক্রান্তহওয়া এবং তিনি সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসার পর তার বাসভবনে দৈনিক যুগান্তরের পক্ষ থেকে একটা ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম যেটি ১১ জুন ২০০৪ সালে যুগান্তরের অর্ধপৃষ্ঠারও বেশি জায়গা জুড়ে ছাপা হয়েছিল৷ জার্মানিতে তিনি যাওয়ার আগে দেশে সেটিই ছিল তার শেষ ইন্টারভিউ৷ সেদিন অনেক কথা বলেছিলেন তিনি৷ সেদিনও লক্ষ্য করেছিলাম লেখক সত্তার দ্বন্দ্বের কারণে একজন লেখক আরেকজন লেখকের ব্যক্তি সত্তাকে কী পরিমাণ সংকীর্ণ দৃষ্টিতে দেখতে পারেন৷ হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, ফরহাদ মজহার আমেরিকায় ভৃত্যের কাজ করে এসে দেশে মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবী সেজে এনজিও করে৷ আর লিখলেই আমেরিকার বিরুদ্ধে লেখে৷ তার এমন বক্তব্যে আমি বলি, আমেরিকার বিরুদ্ধে লেখা কী অন্যায়? তিনি বলেন, আমেরিকা একটি দর্শনে পরিণত হয়েছে৷ পৃথিবীর সব বুদ্ধিজীবী আমেরিকাকেন্দ্রিক৷ আমেরিকায় থাকতে চায়, আবার গালিও দেয়৷ এডওয়ার্ড সাঈদ পাকিস্তানে থাকলে আমেরিকাকে গালি দিতেন না৷ উলেখ্য, ফরহাদ মজহারের কয়েকটি লেখা সেসময়ে প্রকাশিত হয়েছিল যেগুলোর বিষয় ছিল আফগানিস্তানের ওপর আমেরিকান আধিপত্যের প্রতিবাদ জানিয়ে৷
হুমায়ুন আজাদ সেদিন বলেছিলেন, আফগানিস্তানে আমেরিকার হস্তক্ষেপ মঙ্গলজনক এবং ফরহাদ মজহারের লালন ভক্তিকে ব্যঙ্গ করেছিলেন এই বলে ‘লালনকে জানার জন্য নাইন পাস হলেই চলে৷’ ইন্টারভিউ শেষে অবশ্য, ফরহাদ মজহারের নামোলেখ না করার অনুরোধ করেছিলেন৷ সেই অনুরোধ আমি রেখেছিলাম৷ তবে ওই ইন্টারভিউ পড়লে যে কারো বুঝতে অসুবিধা হবে না যে, তিনি ফরহাদ মজহারকে অযৌক্তিভাবে খাটো করতে চেয়েছেন৷ আবার হুমায়ুন আজাদের মৃতু্যর পর এক মাস যেতে না যেতেই সলিমুলাহ খান যুগান্তরের সাময়িকীতে পেটোর দৃষ্টিতে লেখক আসলে কতটা স্বাধীন এ বিষয়ে লিখে জানিয়েছিলেন, লেখক কখনো প্রকৃত স্বাধীন হতে পারেন না৷ অথচ তখন ‘লেখকের স্বাধীনতা’ ইসু নিয়ে লেখক সমাজ উত্তেজিত৷
সলিমুলাহ খানের ওই লেখার মূলভাবের সঙ্গে আমারও চিন্তার ঐক্য রয়েছে কিন্তু ওই সময়ে এ লেখটি ছাপা হওয়ায় উদ্বিগ্ন ছিলাম এই ভেবে যে, লেখাটি রক্ষণশীল মহল নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ নিতে পারে, ঠিক যেমনি সম্প্রতি হুমায়ূন আহমেদের দেয়া বক্তব্যকে রক্ষণশীলরা কাজে লাগাতে পারে৷ হুমায়ূন আহমেদ বলেছেন, বাংলাদেশের সব লেখক স্বাধীন৷ তিনি কী জানেন, এদেশে লিখতে হয় সেলফ সেন্সরড হয়ে৷ ওয়ান-ইলেভেনের পর নাঈমুল ইসলাম খান (নাঈম ভাই) এ বিষয়ে লিখেছেনও৷ নাম বললে অনেক হবে, অনেক লেখককেই ক্ষমতাবানদের কোপানলে স্রেফ লেখালেখির কারণে নানা সময়ে পড়তে হয়েছে৷
ফরহাদ মজহার, শাহরিয়ার কবির, মুনতাসীর মামুনরা সেকথা জানেন৷ গরিব আনসারদের কুকুর-বেড়ালের মতো হত্যা করার প্রতিবাদে ফরহাদ মজহারকে জেলে যেতে হয়েছে৷ সত্যি কথা কী, পুঁজিতান্ত্রিক সমাজে লেখকদের স্বাধীনতা বলে কিছু নেই, থাকতে পারে না! বুদ্ধিজীবী, লেখক ও শিল্পীর স্বাধীনতা সম্পর্কে ফরহাদ মজহার মনে করেন, একজন লেখকের হস্তমৈথুন ভালো লাগে, বাথরুমে গিয়ে সেটা করলেই পারে৷ ওই কাজটির জন্য তাকে কেউ মন্দ বললে তার পক্ষে তিনি দাঁড়াবেন৷ কোনো মেয়ে যদি মনে করে যেহেতু ছেলেরা চারটা বৌ রাখতে পারে৷ অতএব তারও চাই চারটা পুরুষ৷ পুরুষতন্ত্রের যুগে চারটা পুরুষকে যদি সেই মেয়ে একসঙ্গে রাখতে পারে তবে ফরহাদ মজহার বলবেন, বাপের বেটি একখানা৷ তবে পেটের দাবি আগে নাকি লিঙ্গের দাবি আগে তুলতে হবে সেটা হচ্ছে বিবেচ্য বিষয়৷ আবার পেটের দাবির কথা বলে লিঙ্গের দাবিকে অস্বীকার করারও পক্ষে নন তিনি৷ কারণ তিনি জানেন সকল নৈতিকতাই কোনো না কোনো শ্রেণীর নৈতিকতা৷
ফরহাদ মজহার দৈনিক আজকের কাগজে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, ‘যে সমাজে মানুষের শরীর পুঁজির অধীন, অর্থাত্ মানুষের শ্রম বা মেহনত মানেই পুঁজির স্ফীতি ও পুঞ্জিভবনের জন্য পরিশ্রম, অপরের জন্য খেটে মরা, সেই সমাজের লেখকরা বলে বেড়ায় আমাদের শরীরের মুক্তির দরকার কী? আমাদের পেটের মুক্তির দরকার কী? আমাদের মেহনতের মুক্তির দরকার কী? আমাদের আছে স্বাধীন ও সার্বভৌম লিঙ্গ৷ আমরা চাই লিঙ্গের স্বাধীনতা৷ আর এটাকেই তারা লেখকের স্বাধীনতা আকারে প্রচার করে৷’
এখন, হুমায়ূন আহমেদ লেখক হিসেবে কেমন স্বাধীনতা ভোগ করছেন_ সেটা তিনিই ভালো করে জানেন!
ই-মেইল: debdulalmunna@yahoo.com
খবরটি পড়েছেন :1849এমন আরো কিছু পোষ্ট:
- হুমায়ূন আহমেদের মন্তব্যে নিন্দার ঝড়
- ১২ আগস্ট ছিল ড. হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুদিবস
- হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন ঋণগ্রস্ত চোখে
- হুমায়ুন আজাদ
- জয়তু কথাশিল্পের কবি হুমায়ূন আহমেদ
- হুমায়ূন আহমেদ, এক চক্ষুষ্মান তীরন্দাজ
- শেল্টেক পদক পেলেন কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ও স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন
- প্রত্যেক দলের থলেতে একটা করে বিড়াল আছেঃ হুমায়ুন আহমেদ
- কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ
- সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ, যখন আমি… (কিস্তি ৬)
You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0 feed. Both comments and pings are currently closed.


ভাই, হুমায়ূন আহমেদের সাক্ষাত্কারের লিংকটা কি আপনার কাছে আছে? থাকলে দিন প্লীজ।
আমার ব্লগের \”মুক্তচিনা\” ট্যাগ এ ইন্টারভিউটা আছে৷ তারপর ও সমকালের লিংকটা নিচে দিলাম৷ ধন্যবাদ আপনাকে ….
http://taiyabs.wordpress.com/2008/07/28/%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A7%87%E0%A6%95-%E0%A6%A6%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%A5%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%8F%E0%A6%95%E0%A6%9F%E0%A6%BE/
http://www.shamokal.com/archive.details.php?nd=2008-07-18&nid=96213